লিওনেল মেসির অবসর: আর্জেন্টিনার ২১ বছরের অধ্যায়ের শেষ

 

আজ বৃহস্পতিবার, ১৯ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২০ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

লিওনেল মেসির বিদায়: আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সির ২১ বছরের মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়


লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসর এবং তাঁর ২১ বছরের আন্তর্জাতিক


লিওনেল মেসির অবসর: আর্জেন্টিনার ২১ বছরের অধ্যায়ের শেষ


লিওনেল মেসির অবসরে আর্জেন্টিনার ২১ বছরের এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের শেষ। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, রেকর্ড ও উত্তরাধিকারের বিশ্লেষণ থাকছে এখানে।

এই দিনটি আসবে—ফুটবলবিশ্ব তা জানত। কিন্তু দিনটি যখন সত্যিই এলো, তখন প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও শূন্যতা তৈরি হলো। লিওনেল মেসির অবসর এখন আর সম্ভাবনা নয়, বাস্তবতা। আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে দুই দশকের বেশি সময় কাটানোর পর মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

লিওনেল মেসির অবসর, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি
লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের শেষ। ২১ বছরের অসাধারণ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপসহ একাধিক শিরোপা ও অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন ফুটবল কিংবদন্তি।


লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা থেকে অবসর শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলারের বিদায় নয়; এটি একটি প্রজন্মের ফুটবল-দেখার অভ্যাস, আবেগ এবং স্মৃতিরও সমাপ্তি। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার ০-১ ব্যবধানে পরাজয়ের পর মেসি নিজের বিদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবেন। পরে হাতে লেখা তিন পৃষ্ঠার চিঠি প্রকাশ করে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, আর জাতীয় দলের হয়ে খেলবেন না।

মেসি জানিয়েছেন, তিনি চিঠিটি মূলত ২১ জুলাই, বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পর লিখেছিলেন। তাঁর বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর সেই সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়।

৩৯ বছর বয়সে মেসি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের ইতি টেনেছেন। ২০০৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তিনি আর্জেন্টিনার ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ছিলেন।

আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও তাঁর বিদায়কে বিশেষ মর্যাদায় তুলে ধরেছে। মেসির নিজের ভাষায়, জাতীয় দলের হয়ে খেলার সময় শেষ হয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ দেওয়ার সময় এসেছে।

মেসির জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার সবচেয়ে প্রতীকী দিক হলো, তাঁর শেষ ম্যাচটিও হয়েছিল সেই নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি অঞ্চলে, যেখানে ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর তিনি প্রথমবার আন্তর্জাতিক অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এক দশক পর একই অঞ্চলে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় লেখা হলো। এ যেন এক পূর্ণ বৃত্ত।

২০১৬ সালে হতাশা তাঁকে অবসর নিতে বাধ্য করেছিল। ২০২৬ সালে অভিজ্ঞতা, অর্জন, বয়স এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করে তিনি নিজেই দরজা বন্ধ করলেন।

মেসির ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল একাধিক বিপরীত অভিজ্ঞতার সমন্বয়। শুরুতেই ছিল প্রত্যাশা, এরপর সমালোচনা, ব্যর্থতা, ব্যক্তিগত হতাশা এবং শেষ পর্যন্ত অভাবনীয় সাফল্য।

২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক ম্যাচেই লাল কার্ড দেখার ঘটনা তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটিকে অস্বাভাবিক করে তুলেছিল। ২০০৬ বিশ্বকাপে তিনি তরুণ প্রতিভা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত হন। গোল ও অ্যাসিস্ট দিয়ে নিজের সামর্থ্যের জানান দেন।

এরপর ২০০৭ কোপা আমেরিকা ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হার, ২০১০ বিশ্বকাপে হতাশা, ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজয় এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্যর্থতা—সবকিছু মিলিয়ে মেসির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছিল।

মেসির ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে তাই শুধু ট্রফির সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি ছিল বারবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প।

২০১৬ সালে চিলির বিপক্ষে কোপা আমেরিকা ফাইনালে হারের পর মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরে আসেন। সেই প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার সম্পূর্ণ নতুন রূপ নেয়।

তারপর আসে ২০২১ কোপা আমেরিকা জয়। এরপর ২০২২ সালের ফাইনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপ জয়। ২০২৪ সালে আরেকটি কোপা আমেরিকা শিরোপা তাঁর আন্তর্জাতিক সাফল্যের তালিকাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

২০২২ বিশ্বকাপ ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে মেসি সেই দীর্ঘদিনের প্রশ্নেরও উত্তর দেন—জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বড় মঞ্চে তিনি কি সত্যিই সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করতে পারবেন? উত্তরটি ছিল পরিষ্কার। হ্যাঁ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য

মেসির নিজের বিদায়ী বার্তাই এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তিনি জানান, সিদ্ধান্তটি তাঁর জন্য কষ্টের হলেও তিনি মনে করেন সময় এসেছে। তিনি বলেন, জাতীয় দলের হয়ে নিজের সবটুকু দেওয়ার পর এখন নতুন প্রজন্মের বড় খেলোয়াড়দের সুযোগ পাওয়ার সময়।

মেসির বিদায় বার্তায় জাতীয় দলের প্রতি ভালোবাসা ছিল স্পষ্ট। তিনি তাঁর পরিবার, কোচ, সতীর্থ, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে জানান, এখন থেকে তিনি জাতীয় দলকে একজন সমর্থক হিসেবে বাইরে থেকে উৎসাহ দেবেন।

আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও মেসির বিদায়কে গভীর আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেছে। FIFA-ও তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তিকে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরেছে।

তাঁর সতীর্থদের প্রতিক্রিয়াতেও মেসির প্রভাব স্পষ্ট। তাঁর সঙ্গে খেলার সুযোগকে অনেকেই স্বপ্ন পূরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই প্রভাব কেবল মাঠের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি একটি পুরো প্রজন্মের খেলোয়াড়কে অনুপ্রাণিত করেছেন।

ঘটনার কারণ ও পটভূমি

মেসির জাতীয় দল থেকে অবসরের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং কয়েকটি বাস্তবতা একসঙ্গে কাজ করেছে।

প্রথমত, বয়স। ২০২৬ সালে মেসির বয়স ৩৯। এই বয়সে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক ফুটবলের শারীরিক ও মানসিক চাপ সামলানো অত্যন্ত কঠিন।

দ্বিতীয়ত, তিনি ইতোমধ্যেই জাতীয় দলের প্রায় সব বড় অর্জন নিজের করে নিয়েছেন। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা এবং অলিম্পিক স্বর্ণ—আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর অর্জনের তালিকা অসাধারণ।

তৃতীয়ত, নতুন প্রজন্মকে জায়গা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। মেসি নিজেই বলেছেন, সামনে এমন কিছু তরুণ খেলোয়াড় রয়েছে যারা জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার যোগ্য।

চতুর্থত, ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়তো একটি স্বাভাবিক সমাপ্তির জায়গা তৈরি করেছে। আর্জেন্টিনা স্পেনের কাছে ০-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ শেষ করে এবং সেটিই হয়ে যায় মেসির সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

পঞ্চমত, ব্যক্তিগত জীবনের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। মেসির বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে আরও দৃঢ় হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসি, অবসর ও ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের প্রতীকী ছবি
বিদায় নয়, এটি একটি কিংবদন্তির নতুন অধ্যায়ের শুরু। 
আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২১ বছরের পথচলায় লিওনেল মেসি উপহার দিয়েছেন অগণিত স্মৃতি, রেকর্ড ও গৌরব।
একটি প্রজন্মের প্রিয় নায়ক হয়তো মাঠ ছাড়বেন, কিন্তু তাঁর জাদু থেকে যাবে চিরকাল।


বিশ্লেষণ ও প্রভাব

মেসির অবসর নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আর্জেন্টিনা কি তাঁকে ছাড়া একইভাবে এগোতে পারবে?

সহজ উত্তর হলো, তাৎক্ষণিকভাবে কঠিন হবে।

মেসির আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারের অর্জন কেবল গোল বা অ্যাসিস্ট দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তিনি দলের আক্রমণ সংগঠিত করেছেন, মাঝমাঠ থেকে খেলা তৈরি করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করেছেন এবং সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছেন।

তাঁর সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায়। একই খেলোয়াড় কখনো স্ট্রাইকারের মতো শেষ করেছেন, কখনো মিডফিল্ডারের মতো আক্রমণ তৈরি করেছেন, আবার কখনো প্লেমেকারের মতো পুরো ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

এই কারণেই মেসির অবসরের পর আর্জেন্টিনাকে শুধু একজন গোলদাতা খুঁজলেই হবে না। তাদের এমন একটি নতুন কাঠামো তৈরি করতে হবে যেখানে একাধিক খেলোয়াড় সম্মিলিতভাবে মেসির সৃষ্টিশীলতার ঘাটতি পূরণ করতে পারবেন।

মেসির অবসরের পর আর্জেন্টিনা সম্ভবত সবচেয়ে বড় যে সমস্যার মুখোমুখি হবে তা হলো নির্ভরতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। দীর্ঘ সময় ধরে দলের খেলোয়াড়রা জানতেন, কঠিন মুহূর্তে মেসিকে বল দিলে কোনো না কোনো সমাধান বের হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এই নির্ভরতা একই সঙ্গে শক্তি এবং দুর্বলতা।

মেসি থাকলে দল অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস পায়। কিন্তু মেসি না থাকলে সেই নির্ভরতার জায়গাটি শূন্য হয়ে যায়।

প্রশ্ন ১: মেসির জাতীয় দল থেকে অবসর কি চূড়ান্ত?

হ্যাঁ। মেসি আনুষ্ঠানিকভাবে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসর ঘোষণা করেছেন। FIFA এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন উভয়েই তাঁর সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে।

প্রশ্ন ২: আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে মেসির শেষ ম্যাচ কোনটি?

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটিই ছিল আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে মেসির শেষ ম্যাচ। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ০-১ গোলে হারে।

প্রশ্ন ৩: মেসি কেন অবসর নিলেন?

বয়স, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ক্লান্তি, নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে ফেলার অনুভূতি এবং নতুন প্রজন্মকে সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা—সব মিলিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাবার মৃত্যুর পর সিদ্ধান্তটি আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মেসি নিজেই জানিয়েছেন।

প্রশ্ন ৪: মেসির আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন কী?

২০২২ বিশ্বকাপ জয় নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় অর্জন। এর পাশাপাশি ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফাইনালিসিমা এবং ২০০৮ অলিম্পিক স্বর্ণও তাঁর আন্তর্জাতিক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রশ্ন ৫: মেসির অবসরের পর আর্জেন্টিনার কী পরিবর্তন হতে পারে?

দলকে ধীরে ধীরে মেসি কেন্দ্রিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের আরও দায়িত্ব নিতে হবে এবং কোচিং স্টাফকে বিকল্প সৃজনশীল কাঠামো তৈরি করতে হবে। তবে মেসির মতো একজন খেলোয়াড়ের শূন্যতা কোনো একজন খেলোয়াড় দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

মেসির অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান ও উত্তরাধিকার

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল নিয়ে। তিনি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম সফল খেলোয়াড়।

বিশ্বকাপে তিনি ছয়টি আসরে খেলেছেন। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি ২০১৪ ও ২০২৬ সালে ফাইনালে খেলেছেন। FIFA তাঁর ২০২৬ সালের বিদায়কে একটি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক যাত্রার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে বর্ণনা করেছে।

মেসির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার অবশ্য পরিসংখ্যানের বাইরেও।

একটি প্রজন্ম তাঁর খেলা দেখে বড় হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে রাত জেগে বার্সেলোনা, আর্জেন্টিনা এবং মেসির ম্যাচ দেখার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। মেসির বিদায় তাই শুধু আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য নয়, বিশ্বব্যাপী ফুটবলপ্রেমীদের জন্যও আবেগের মুহূর্ত।

মেসির আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারের অর্জন তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম সফল আন্তর্জাতিক ফুটবলারে পরিণত করেছে। কিন্তু তাঁর আসল উত্তরাধিকার হয়তো আরও গভীরে।

তিনি ফুটবলের পজিশনের প্রচলিত ধারণাকেই অনেকটা বদলে দিয়েছেন। তিনি একই সঙ্গে গোলদাতা, প্লেমেকার, ড্রিবলার ও সৃষ্টিশীল আক্রমণভাগের নেতা ছিলেন।

তাঁকে কেবল একটি পজিশনে আটকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা / পরবর্তী পদক্ষেপ

এখন আর্জেন্টিনার সামনে নতুন যুগ শুরু করার চ্যালেঞ্জ।

সবচেয়ে বড় কাজ হবে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা। মেসির জায়গায় একজন নতুন অধিনায়ক আসবেন, কিন্তু মেসির মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব পাওয়া সহজ হবে না।

দলের তরুণ খেলোয়াড়দের ওপর দায়িত্ব বাড়বে। এনজো ফার্নান্দেজ, আলেহান্দ্রো গারনাচোসহ নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের এখন নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে হবে। তবে তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজেদের দলীয় কাঠামো তৈরি করা।

আর্জেন্টিনার জন্য ইতিবাচক দিক হলো, মেসির বিদায়ের সময় দলটি সম্পূর্ণ শূন্য অবস্থায় নেই। তাদের কাছে বিশ্বমানের খেলোয়াড়, অভিজ্ঞ কোচিং কাঠামো এবং সাম্প্রতিক সাফল্যের ভিত্তি রয়েছে।

কিন্তু মেসির অবসরের পর আর্জেন্টিনাকে একটি নতুন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে:

মেসিকে ছাড়া তারা কেমন দল?

এই প্রশ্নের উত্তর আগামী কয়েক বছরেই পাওয়া যাবে।

একটি যুগের সমাপ্তি

মেসির জাতীয় দল থেকে অবসর ফুটবলের ইতিহাসে একটি যুগের সমাপ্তি। ২০০৫ সালে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেখানে ছিল হতাশা, সমালোচনা, পরাজয়, প্রত্যাবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বজয়ের আনন্দ।

২০১৬ সালে তিনি যখন প্রথম অবসর নিয়েছিলেন, তখন তাঁর গল্প অসম্পূর্ণ মনে হয়েছিল। ২০২৬ সালে বিদায় নেওয়ার সময় গল্পটি সম্পূর্ণ।

তিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন। কোপা আমেরিকা জিতেছেন। ফাইনালিসিমা জিতেছেন। অলিম্পিক স্বর্ণ জিতেছেন। রেকর্ড ভেঙেছেন। অসংখ্য ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তবু মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো ট্রফির সংখ্যা নয়।

তিনি এমন এক ফুটবলীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করেছেন যা পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।

একজন দর্শক তাঁকে মাঠে দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। একজন শিশু তাঁকে দেখে ফুটবল খেলতে শুরু করেছে। একজন তরুণ খেলোয়াড় তাঁর মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। আর একটি প্রজন্ম তাঁর ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাক্ষী হয়েছে।

এ কারণেই মেসির বিদায় বার্তা একটি জাতীয় দলের খেলোয়াড়ের অবসরের চেয়েও বড় ঘটনা।

এটি একটি ফুটবল-যুগের বিদায়।

উপসংহার

লিওনেল মেসির অবসরের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার ফুটবলের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের শেষ হলো। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি ব্যর্থতা থেকে সাফল্য, সমালোচনা থেকে ভালোবাসা এবং অসম্পূর্ণতা থেকে বিশ্বজয়ের পথে পৌঁছেছেন।

আর্জেন্টিনা এখন নতুন প্রজন্মের দিকে তাকাবে। কিন্তু মেসির জায়গা পূরণ করার প্রশ্নটি সহজ নয়। তাঁর মতো আরেকজন খেলোয়াড় আসবেন কি না, তার উত্তর সময়ই দেবে।

হয়তো নতুন কোনো মেসি আসবে। হয়তো আসবে না।

কিন্তু ফুটবলবিশ্বের একটি প্রজন্ম নিশ্চিতভাবেই বলতে পারবে—তারা একজন সত্যিকারের কিংবদন্তিকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খেলতে দেখেছে।

ধন্যবাদ, লিওনেল মেসি।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে আপনার গল্প শেষ হলেও ফুটবলের ইতিহাসে আপনার অধ্যায় শেষ হওয়ার নয়।

আপনার মতে, মেসির অবসরের পর আর্জেন্টিনা কি বিশ্ব ফুটবলে একই আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে? মন্তব্যে আপনার মতামত জানান। লেখাটি ভালো লাগলে ফুটবলপ্রেমী বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন এবং আপনার মতামত কমেন্টে লিখুন।

লেখক:
মোঃ নজরুল ইসলাম
অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

সোর্স:
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA)
FIF , Reuters , The Guardian , LA NACION , Associated Press , CBS News

[ { "@type": "Question", "name": "মেসির জাতীয় দল থেকে অবসর কি চূড়ান্ত?", "acceptedAnswer": { "@type": "Answer", "text": "হ্যাঁ। লিওনেল মেসি আনুষ্ঠানিকভাবে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসর ঘোষণা করেছেন।" } }, { "@type": "Question", "name": "আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে মেসির শেষ ম্যাচ কোনটি?", "acceptedAnswer": { "@type": "Answer", "text": "২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটিই ছিল আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে মেসির শেষ ম্যাচ।" } }, { "@type": "Question", "name": "মেসি কেন অবসর নিলেন?", "acceptedAnswer": { "@type": "Answer", "text": "বয়স, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে ফেলার অনুভূতি এবং নতুন প্রজন্মকে সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তাঁর সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ।" } }, { "@type": "Question", "name": "মেসির আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন কী?", "acceptedAnswer": { "@type": "Answer", "text": "২০২২ সালের FIFA বিশ্বকাপ জয় তাঁর আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন। এছাড়া কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা ও অলিম্পিক স্বর্ণও তাঁর বড় অর্জনের অংশ।" } }, { "@type": "Question", "name": "মেসির অবসরের পর আর্জেন্টিনার কী পরিবর্তন হতে পারে?", "acceptedAnswer": { "@type": "Answer", "text": "আর্জেন্টিনাকে মেসিকেন্দ্রিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের কেন্দ্র করে একটি নতুন দলীয় কাঠামো তৈরি করতে হবে।" } } ]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ