ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ঐতিহাসিক জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। পাঠকালে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাশা করে যে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-কে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের তফসিলে এই ঘোষণাপত্র অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
![]() |
| ঐতিহাসিক জুলাই ঘোষণাপত্র |
তিনি আরও বলেন, জনগণ জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে ঘোষণা করছে এবং শহীদদের পরিবার, আহত যোদ্ধা ও আন্দোলনকারী ছাত্রদের জন্য পূর্ণ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চায়।
ঘোষণাপত্রে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানটি জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয়ে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মাধ্যমে সম্মান জানানো হয়।
ঘোষণাপত্রটি হুবহু নিচে উপস্থাপন করা হলো:
১. এই দেশের জনগণ ইতিহাসজুড়ে উপনিবেশবিরোধী লড়াই এবং পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে।
২. বাংলাদেশের জনগণ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে দীর্ঘকাল সংগ্রাম করে এসেছে।
৩. স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয় এবং সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল করে তোলে।
৪. একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা গঠন এবং মতপ্রকাশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণের কারণে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লব সংঘটিত হয়।
৫. ১৯৯০ সালে দীর্ঘ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটে এবং ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে।
৬. ১/১১ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একচ্ছত্র ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ উন্মুক্ত হয়।
৭. সংবিধানে অবৈধ ও একতরফা পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
৮. শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, খুন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং বিচারব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়।
৯. এই সরকার আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং দেশে মাফিয়া রাষ্ট্রের অবয়ব তৈরি করে।
১০. দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, অর্থপাচার এবং পরিবেশ ধ্বংস করে দেশের অর্থনীতিকে বিপন্ন করে।
১১. ষোলো বছর ধরে জনগণ নিরন্তর আন্দোলনের মাধ্যমে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে এসেছে।
১২. বিদেশি প্রভুত্বের বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলন দমন করে আওয়ামী লীগ সরকার।
১৩. তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।
১৪. বিরোধী মতের রাজনীতিকদের নির্যাতন ও চাকরিতে কোটাব্যবস্থার বৈষম্যে তরুণদের ক্ষোভ জন্ম নেয়।
১৫. বিরোধী দল ও জনগণের আন্দোলনকে দমন করতে ভয়াবহ নিপীড়ন চালানো হয়।
১৬. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে বর্বরতা চালানো হয়, যা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
১৭. ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণ ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দেয়; সহিংসতায় বহু প্রাণহানি ঘটে।
১৮. দীর্ঘ আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা পদত্যাগে বাধ্য হন।
১৯. এই গণঅভ্যুত্থান জনগণের সার্বভৌমত্বের বৈধ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রয়োগ।
২০. এরপর অবৈধ সংসদ বিলুপ্ত করে ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।
২১. এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ বৈষম্য, দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় প্রকাশ করে।
২২. জনগণ বিদ্যমান সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে।
২৩. জনগণ পূর্ববর্তী সরকারের সকল অপরাধের বিচারের প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
২৪. শহীদদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে ঘোষণা এবং আইনি সুরক্ষার অঙ্গীকার করা হয়।
২৫. একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আইনের শাসন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রত্যয় জানানো হয়।
২৬. পরিবেশ ও জলবায়ু সহিষ্ণু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন কৌশলের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
২৭. এই ঘোষণাপত্র ভবিষ্যৎ সংবিধানের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়।
২৮. ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে বিজয়ী জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হলো।
0 Comments