Advertisement

0

দান ফেরত নেওয়া ইসলামে কেন জঘন্য পাপ

 

আজ বৃহস্পতিবার ২৪রা আশ্বিন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৯ অক্টোবর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪৭ হিজরি

দান ফেরত নেওয়া ইসলামে কেন জঘন্য পাপ

দান-সদকা ইসলামে মহান গুণ, কিন্তু দান ফিরিয়ে নেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। জানুন কেন নবী (সা.) এটিকে জঘন্য পাপ বলেছেন, হাদিস ও শিক্ষা সহ।

দান ফেরত নেওয়া ইসলামে কেন জঘন্য পাপ
ইসলামে দান ফেরত নেওয়া নিষিদ্ধ, দান-সদকার হাদিস, হজরত ওমরের দানের ঘটনা, নবী (সা.)-এর শিক্ষা।
🌿 দান ফেরত নেওয়া: ইসলামে এক ঘৃণিত কাজ

দান করা ইসলামে এক প্রশংসনীয় ও মহৎ গুণ। এটি কেবল গরিবের সহায়তা নয়, বরং নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার একটি উপায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—যে ব্যক্তি দান করার পর তা ফেরত নেয়, তার প্রতি ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর।

রাসুলুল্লাহ ﷺ স্পষ্টভাবে বলেছেন:

“তুমি তোমার কৃত দান ফেরত নিয়ো না।”

📖 (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৯০)

এই সংক্ষিপ্ত বাণীতেই রয়েছে গভীর শিক্ষা—দান একবার করলে তা আর নিজের বলে মনে করা উচিত নয়।

💰 দান-সদকার মাহাত্ম্য ও আধ্যাত্মিক পুরস্কার

ইসলাম দান-সদকাকে শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং আখিরাতের প্রস্তুতি হিসেবেও বিবেচনা করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

“যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করে, তার দান আল্লাহ বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন।”

📖 (সূরা আল-বাকারা: ২৬১)

দান-সদকার সুফল:

আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টি লাভ হয়।

গুনাহ মাফ হয় এবং রিজিক বৃদ্ধি পায়।

দান দূর করে বিপদ ও মুসিবত।

সমাজে দয়া ও সমবেদনা বৃদ্ধি পায়।

এমন মহৎ কাজের পর কেউ যদি সেই দান ফেরত নেয়—তবে তা নিজেরই ইমান ও নৈতিকতার অবমাননা।

 দান ফিরিয়ে নেওয়ার কঠোর নিষেধাজ্ঞা

রাসুলুল্লাহ ﷺ এর আরেকটি হাদিসে এ কাজের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে।

“নিজের দান প্রত্যর্পণকারী ব্যক্তি সেই কুকুরের মতো, যে বমি করে পরে তা আবার খায়।”

📖 (সহিহ মুসলিম: ৪০৬৮)

এত কঠোর উপমা দেওয়ার কারণ হলো—দান ফেরত নেওয়া মানে, যে দান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দেওয়া হয়েছিল, তা এখন আবার দুনিয়ার লোভে ফিরিয়ে আনা। এটি শুধু অন্যায় নয়, বরং নিজের আত্মাকে অপবিত্র করার মতো।

🐎 হজরত ওমর (রা.)-এর ঘটনা: নবী (সা.)-এর শিক্ষা

একদিন হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একটি ঘোড়া আল্লাহর রাস্তায় দান করেন।

পরে তিনি দেখলেন, যার কাছে দিয়েছেন সে ঘোড়াটি সঠিকভাবে ব্যবহার করছে না।

তিনি ভাবলেন—“ঘোড়াটি আমি ফিরিয়ে নিই বা অল্প দামে কিনে নিই।”

তিনি নবী করিম ﷺ এর কাছে গিয়ে বললেন,

“হে আল্লাহর রাসুল, আমি যে ঘোড়াটি দান করেছিলাম, সেটি এখন নষ্ট হয়ে গেছে। আমি কি সেটি কিনে নিতে পারি?”

তখন রাসুল ﷺ বললেন,

“এক দিরহামের বিনিময়েও তুমি তা খরিদ করবে না। কারণ যে ব্যক্তি নিজের দান ফিরিয়ে নেয়, সে সেই কুকুরের ন্যায়, যে নিজে বমি করে আবার তা খায়।”

📖 (সহিহ মুসলিম: ৪০৫৭)

এই হাদিস ইসলামী নীতিশিক্ষার এক অনন্য দৃষ্টান্ত—দান একবার আল্লাহর পথে দিলে তা চিরতরে তাঁরই হুকুমে চলে যায়।

 কেন ইসলামে দান ফেরত নেওয়া নিষিদ্ধ?

 নৈতিক দিক থেকে:

দান ফেরত নেওয়া মানে নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা, যা মুসলমানের মর্যাদার পরিপন্থী।

 আধ্যাত্মিক দিক থেকে:

এতে আত্মা কলুষিত হয়, নিয়তের পবিত্রতা নষ্ট হয়।

 সামাজিক দিক থেকে:

যাকে দান করা হয়েছে, তার মনে কষ্ট ও অপমান সৃষ্টি হয়।

 আখিরাতের দিক থেকে:

দান ফেরত নেওয়ার ফলে সেই দানের সওয়াবাতিল হয়ে যায়।

 দান করার পর কী করা উচিত নয়

দানিয়ে গর্ব করা বা অন্যের মনে কষ্ট দেওয়া।

দান ফেরত নেওয়া বা তার উপর কর্তৃত্ব দেখানো।

দান করার পর লোক দেখানো মন্তব্য বা পোস্ট করা।

দানগ্রহীতাকে তুচ্ছজ্ঞান করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

“যারা দান করে এবং পরে উপকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না কিংবা কষ্ট দেয় না—তাদের জন্য রয়েছে পুরস্কার।”

📖 (সূরা আল-বাকারা: ২৬২)

🌙 দান ও নিয়তের বিশুদ্ধতা: কুরআনের শিক্ষা

কুরআনে আল্লাহ তাআলা নিয়তের গুরুত্বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

দান যেন হয় কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য—মানুষের প্রশংসা বা দুনিয়ার লাভের জন্য নয়।

“তোমরা যা কিছুই ব্যয় করো, তা আল্লাহ ভালোভাবেই জানেন।”

📖 (সূরা আল-বাকারা: ২৭৩)

অতএব, দান করে তা ফেরত নেওয়া মানে নিজের নিয়তকেও সন্দেহের মধ্যে ফেলা।

 একটি ছোট গল্প: নিয়ত ও দানের মূল্য

এক ব্যক্তি প্রতিদিন গোপনে দান করতেন। একদিন ভুলবশত চোরের হাতে দান চলে যায়।

লোকেরা তাঁকে দেখে হাসল, কিন্তু পরদিনও তিনি দান চালিয়ে যান।

দ্বিতীয় দিন তাঁর দান এক ধনী অহংকারী ব্যক্তির হাতে যায়।

তৃতীয় দিন এক নারীর হাতে পড়ে।

শেষে আল্লাহ থেকে বার্তা এল—

“তোমার দান তিনজনের জীবন পাল্টে দিয়েছে। চোর লজ্জায় চুরি ছেড়েছে, ধনী মানুষ উদার হয়েছে, আর নারী তাওবাহ করেছে।”

এ গল্প আমাদের শেখায়—দান শুধু বস্তু নয়, এটি মানুষের হৃদয়ে পরিবর্তন আনে।

দান একবার করলে তা আর ফেরত নেওয়া যাবে না।

দান হলো ঈমান ও মানবতার পরীক্ষা।

দানগ্রহীতার প্রতি দয়া ও সম্মান দেখানো ফরজের অংশ।

নিয়ত বিশুদ্ধ রাখাই দানের আসল মূল্য।

দান ফেরত নেওয়া মানে আল্লাহর সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা।

❓ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

Q1. দান করার পর কেউ যদি তা নষ্ট করে, তখন কি ফেরত নেওয়া যায়?

না, ইসলাম এ অনুমতি দেয়নি। হজরত ওমর (রা.)-এর ঘটনার মাধ্যমে নবী (সা.) স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন।

Q2. দান করলে তার সওয়াব কখন পাওয়া যায়?

যদি নিয়ত আল্লাহর জন্য হয় এবং কোনো অহংকার বা কষ্ট না দেওয়া হয়, তখনই পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যায়।

Q3. দান কি শুধু টাকার মাধ্যমে করতে হয়?

না, জ্ঞান, সময়, শ্রম, হাসি—সবই সদকা। নবী (সা.) বলেছেন, “তোমার ভাইয়ের প্রতি হাসি করাও সদকা।”

Q4. দান ফেরত নিলে কী শাস্তি হতে পারে?

হাদিসে বলা হয়েছে, দান ফেরত নেওয়া ব্যক্তির দৃষ্টান্ত সেই কুকুরের মতো, যে নিজের বমি আবার খায়—এ উপমাই তার ঘৃণ্যতার প্রমাণ।

দান হলো বিশ্বাসের পরিপূর্ণ প্রকাশ। এটি শুধু বস্তু নয়—একটি হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি।

যে মানুষ দান করে, সে আল্লাহর রহমত লাভ করে; আর যে ফেরত নেয়, সে সেই রহমত হারায়।

তাই আসুন—আমরা আমাদের দান-সদকাকে করি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, না যে কোনো প্রতিদানের আশায়।


আরও পড়ুন >জুমার প্রমাণিত ফজিলত আলটিমেট দিন যেখানে ৮০ বছরের গুনাহ মাফ


Post a Comment

0 Comments