১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান বাইতুল মোকাররমে যে দিনে শহীদের রক্তে জেগে উঠেছিল দেশ লেখক আলতাব মোল্লা

আলতাব মোল্লা
১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোটের সমাবেশে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন জেহাদসহ কয়েকজন। সেই দিনের প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্টের গল্প।

আলতাব মোল্লা
![]() |
| ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান বাইতুল মোকাররমে যে দিনে শহীদের রক্তে জেগে উঠেছিল দেশ |
১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর, তখন দেশেরাজপথ উত্তাল এরশাদবিরোধী আন্দোলনে।
সেদিন সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে বাইতুল মোকাররম মসজিদের উত্তর পাশে শুরু হয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোটের বিশাল সমাবেশ।
সমাবেশে একে একে বক্তব্য দেন জোটের নেতারা, আর শেষে বক্তব্য দেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
কিন্তু পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়— পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ, রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বাইতুল মোকাররম, মতিঝিল, ফকিরাপুল ও পল্টন এলাকা।
আল্লাহ ওয়ালা ভবনের সামনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
আন্দোলনকারীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন আল্লাহ ওয়ালা বিল্ডিং–এর সামনে— যা তখন ছিল এরশাদের জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়।
সেখানেই শুরু হয় মূল সংঘর্ষ। পুলিশের গুলি ও জাতীয় পার্টির ক্যাডারদের হামলায় শহীদ হন জেহাদসহ ৭–৮ জন।
প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায়,
“আমার সামনেই ইনকিলাব পত্রিকার ফটোসাংবাদিক হিটু ভাই পায়ে গুলি খেলেন। এটাই ছিল আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট।”
মিরপুরে ফেরার পথে জীবন-মৃত্যুর লড়াই
সংঘর্ষ শেষে লেখক মিরপুরের পথে রওনা দেন। সর্বত্র পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলছিল।
অবশেষে মিরপুর ১২ নম্বরের বাইতুল সালাম মসজিদের পাশে ক্লান্ত শরীরে বসে চানাচুর খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করছিলেন তিনি।
সেই রাতে এশার নামাজের পর বিবিসির সংবাদে প্রচারিত হয়— বাইতুল মোকাররমে ৮ জন নিহত, এবং ভুলবশত তাঁকেও (আলতাব) মৃত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
“তুমি তো মারা গেছো”— জীবিত ফিরে এসে অবিশ্বাস
এরপর যা ঘটল, যেন সিনেমার দৃশ্য—
মসজিদের মুসল্লিরা তাঁকে দেখে হতভম্ব!
চাউল ব্যবসায়ী হিরু ভাই বললেন,
“আলতাব, বিবিসিতে তো বলেছে তুমি মারা গেছো, তাই মসজিদে তোমার জন্য দোয়া হয়েছে।”
বন্ধু শরিফের মা কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন— “বাবা, তুমি বেঁচে আছো?”
অন্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন, কেউ তাঁকে বাসায় নিয়ে গিয়ে দুধ দিয়ে গোসল করান।
মিরপুর ১২ নম্বর সি-ব্লকের প্রতিটি ঘর যেন হয়ে ওঠে তাঁর নিজের ঘর, প্রতিটি মানুষ তাঁর আপনজন।
তিনি বলেন,
“আমি এতিম ছিলাম, কিন্তু সেদিন মিরপুরের প্রতিটি বাবা-মা আমার আপনজন হয়ে গিয়েছিল।”
আল্লাহর রহমত ও কৃতজ্ঞতা
শেষে তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে বলেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন। শুকরিয়া আল্লাহর।”
ইতিহাসের মোড় ঘোরানো সেই দিন
১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবরের সেই বাইতুল মোকাররম সমাবেশ ও জেহাদের শহীদ হওয়া ছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট।
সেই রক্তের বিনিময়ে পরবর্তীতে পতন ঘটে এক স্বৈরশাসকের, আর জন্ম নেয় গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়।
❓FAQ (প্রশ্নোত্তর)
প্রশ্ন ১: ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর কী ঘটেছিল?
উত্তর: সেদিন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭দলীয় জোটের সমাবেশে পুলিশের গুলিতে জেহাদসহ কয়েকজন নিহত হন, যা আন্দোলনের গতি বাড়ায়।
প্রশ্ন ২: “জেহাদ দিবস” কেন পালন করা হয়?
উত্তর: সেই দিনে কিশোর জেহাদের আত্মাহুতিই এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন ৩: ঘটনাটি বাংলাদেশেরাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলেছিল?
উত্তর: এটি ছিল আন্দোলনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত, যা পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের পতন ত্বরান্বিত করে।

0 Comments