আজ শুক্রবার ৯রা কার্তিক ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৪ অক্টোবর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৭ হিজরি
জুমার দিনের ফজিলত ও আমল: মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ দিনের রহস্য
জুমার দিনের ফজিলত, বিশেষ আমল ও দোয়া কবুলের সময় জানুন। ইসলামী দৃষ্টিতে কেন শুক্রবার মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ দিন তা জানুন বিস্তারিত।
জুমার দিনের ফজিলত ও মর্যাদা
ইসলামে শুক্রবার বা জুমার দিনকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন বলা হয়। এটি এমন একটি দিন, যেদিনে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য বিশেষ রহমত ও বরকতের দরজা খুলে দেন। হজরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“আল্লাহ তাআলা আগের জাতিগুলোর কাছে জুমার মর্যাদা অজ্ঞাত রেখেছেন। ইহুদিরা শনিবার নির্ধারণ করেছে, খ্রিস্টানরা রবিবার। আর আমরা জুমার দিনের মর্যাদা পেয়েছি।”
(মুসলিম, হাদিস ৮৫৬)
এই হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায়, জুমা মুসলমানদের জন্য এক অনন্য নিয়ামত।
![]() |
| জুমার দিনের ফজিলত ও আমল—মসজিদে মুসল্লিদের নামাজ, দোয়া, ও সুরা কাহাফ তিলাওয়াতের দৃশ্য; ইসলামিক ফজিলতের প্রতীক। |
রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনজির (রা.) এর বর্ণনায় পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছেন, যা জুমাকে শ্রেষ্ঠ করেছে—
এদিনে হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়।
এদিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতীর্ণ করা হয়।
জুমার দিনেই আদম (আ.)-এর মৃত্যু হয়।
এই দিনে এমন একটি সময় আছে, যখন দোয়া কবুল হয়।
কিয়ামত সংঘটিত হবে জুমার দিনেই।
(ইবনে মাজাহ, হাদিস ৮৯৫)
জুমার দিনের শ্রেষ্ঠ আমলসমূহ
জুমার দিন শুধু নামাজের জন্য নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, দোয়া ও ইবাদতের দিন। নিচে এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল তুলে ধরা হলো।
জুমার নামাজ ও এর মাহাত্ম্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা, এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান পর্যন্ত সময়ের পাপ মোচন করে; যদি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে।”
(মুসলিম, হাদিস ২৩৩)
অর্থাৎ, নিয়মিত নামাজ ও জুমার সালাত বান্দার আত্মাকে পবিত্রাখে।
জুমার দিনে গোসল করা
হজরত আউস বিন আউস (রা.) বর্ণনা করেন—
“যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালোভাবে গোসল করল, দ্রুত মসজিদে গেল, মনোযোগসহ খুতবা শুনল—তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছরের রোজা ও নামাজের সওয়াব দেওয়া হবে।”
(আবু দাউদ, হাদিস ৩৪৫)
এটি দেখায়, জুমার দিন গোসল ও আগেভাগে মসজিদে যাওয়া কত বড় আমল।
🕋 মসজিদে আগে যাওয়া
রাসুল (সা.) বলেছেন—
“যে আগে মসজিদে গেল, সে যেন একটি উট কোরবানি করল; পরে গেলে যেন গরু, ছাগল, মুরগি বা ডিম সদকা করল।”
(বুখারি, হাদিস ৮৪১)
এখানে সময়মতো উপস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
জুমার দিনে দোয়া কবুলের সময়
জুমার দিন এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে যখন বান্দার দোয়া আল্লাহ তাআলা অবশ্যই কবুল করেন। রাসুল (সা.) বলেছেন—
“জুমার দিনে কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে ভালো কিছুর দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। সময়টি আছরের পর খুঁজো।”
(আবু দাউদ, হাদিস ১০৪৮)
📖 সুরা কাহাফ তিলাওয়াতের ফজিলত
জুমার দিনে সুরা কাহাফ পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
রাসুল (সা.) বলেছেন—
“যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে, তা দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে আলোকিত হয়ে থাকবে।”
(আল মুসতাদরাক ২/৩৯৯)
🌹 দরুদ শরিফ পাঠ করা
হজরত আউস বিন আবি আউস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন—
“তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এই দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো, কারণ তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।”
(আবু দাউদ, হাদিস ১০৪৭)
নারীদের জন্য জুমার দিনের আমল
নারীরা ঘরে থেকেই জুমার ফজিলত অর্জন করতে পারেন। তাঁদের জন্য আমলসমূহ:
গোসল ও পবিত্র থাকা
সুরা কাহাফ ও দরুদ শরিফ পাঠ
আছরের পর বিশেষ দোয়া
ঘরে জোহরের নামাজ আদায়
পরিবারের পুরুষ সদস্যদের জুমায় যেতে উৎসাহ দেওয়া
রাসুল (সা.) বলেছেন—
“নারীর ঘরে নামাজ পড়া বাইরে পড়ার চেয়ে উত্তম।”
(মুসনাদে আহমদ ২৬৫৪২)
জুমার দিনে করণীয় ১০টি সুন্নত কাজ
গোসল করা
সুন্দর পোশাক পরা
সুগন্ধি ব্যবহার করা
নখ কাটা ও লোম পরিষ্কার
আগেভাগে মসজিদে যাওয়া
ইমাম খুতবা শুরু করলে চুপ থাকা
বেশি করে দরুদ পাঠ করা
সুরা কাহাফ তিলাওয়াত
দোয়া ও ইস্তেগফার
আত্মসমালোচনা ও তওবা করা
জুমার দিনের তাৎপর্য আজকের সমাজে
বর্তমান দ্রুতগতির জীবনে মুসলমানরা প্রায়ই জুমার দিনকে কেবল ছুটির দিন হিসেবে নেয়। অথচ এটি আত্মার পুনর্জাগরণের দিন। ইসলামী সমাজে জুমা শুধু ইবাদত নয়, বরং সামাজিক ঐক্যের প্রতীক। একত্র নামাজ, খুতবা, দোয়া—সবই মুসলমানদের মধ্যে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বাড়ায়।
ইসলামী পণ্ডিতদের মতে, জুমা হচ্ছে “আত্মিক রিসেট দিবস।” সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোতে মানুষ কর্মব্যস্ত থাকলেও জুমা তাকে আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে আনে। এটি এক ধরনের আত্মসমালোচনার সুযোগ যেখানে বান্দা তার অতীত ভুলগুলো নিয়ে চিন্তা করে নতুনভাবে শুরু করতে পারে।
জুমার দিনের ফজিলত সম্পর্কিত কয়েকটি বাস্তব উদাহরণ
অনেক সাহাবি জুমার দিনকে এত গুরুত্ব দিতেন যে, তারা বৃহস্পতিবারাতেই প্রস্তুতি নিতেন।
মদিনার প্রাচীন সমাজে জুমার নামাজের সময় বাজার বন্ধ রাখা হতো।
ইসলামী ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ও চুক্তি জুমার দিনে সংঘটিত হয়েছে।
জুমার দিন শুধু একটি দিন নয়, এটি মুসলমানদের আত্মার পুনর্জাগরণের মুহূর্ত। এ দিনে গোসল, নামাজ, দোয়া, সুরা কাহাফ তিলাওয়াত ও দরুদ পাঠের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর রহমত লাভ করতে পারি।
তুমি আজকের জুমায় কী আমল করেছ? নিচে মন্তব্যে লিখে অন্য মুসলমান ভাই-বোনদের অনুপ্রাণিত করো।
আরও ইসলামিক অনুপ্রেরণামূলক লেখা পড়তে আমাদের Dhaka News ইসলামিক সেকশন অনুসরণ করো।
Alt Text (SEO Image Description):
জুমার দিনের ফজিলত ও আমল—মসজিদে মুসল্লিদের নামাজ আদায়, দোয়া ও সুরা কাহাফ পাঠের মুহূর্ত।
প্রশ্ন ১: জুমার দিন কোন সময় দোয়া কবুল হয়?
উত্তর: হাদিস অনুযায়ী আছরের পর থেকে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত সময় দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
প্রশ্ন ২: নারীরা কি জুমার নামাজ পড়বেন?
উত্তর: নারীরা চাইলে মসজিদে যেতে পারেন, তবে ঘরে জোহর আদায় করা উত্তম।
প্রশ্ন ৩: সুরা কাহাফ কখন পড়া উত্তম?
উত্তর: বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার মাগরিবের আগে পর্যন্ত যেকোনো সময় সুরা কাহাফ পড়া যায়।
প্রশ্ন ৪: জুমার নামাজ না পড়লে কী হয়?
উত্তর: বিনা অজুহাতে তিন জুমা পরপর বাদিলে মনমরা হয়ে যায় ঈমান। এটি গুরুতর গুনাহ।
প্রশ্ন ৫: জুমার দিনে নখ কাটা বা গোসলের গুরুত্ব কী?
উত্তর: এটি সুন্নত আমল এবং আত্মপরিচ্ছন্নতার প্রতীক, যা সওয়াব বয়ে আনে।
জুমার দিন হচ্ছে আল্লাহর বিশেষ রহমতের দিন। আসুন, আমরা সবাই এ দিনের ফজিলত অর্জনের জন্য নিয়মিত জুমার নামাজ, দোয়া, দরুদ ও কাহাফ তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তুলি।

0 Comments