বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবি সভাপতি ফের ‘নিশ্চিত’ আমিনুল ইসলাম বুলবুল
নাটকীয়ভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল; বিসিবি নির্বাচন ঘিরে ওঠা সরকারি হস্তক্ষেপ ও অনিয়মের অভিযোগ বিশ্লেষণ।
![]() |
| বিসিবি নির্বাচনে ভোট হয় |
২০২৫ সালের ৩০ মে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মনোনয়ন পেয়ে বিসিবি সভাপতির দায়িত্ব নেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। এরপর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ঢাকা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে, সোমবার অনুষ্ঠিত বিসিবি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হলেন। এই ধারাবাহিক প্রবণতা রাজনৈতিকভাবে অনেক প্রশ্ন তোলে — ক্রিকেট শাসনের স্বনির্ভরতা, সংগঠক গণতন্ত্র ও নির্বাচন স্বচ্ছতা তা কতটুকু বজায় রেখেছে?
নিয়ন্ত্রকের আসনে আসার আগে চার দফায় নির্বাচিত হয়েছেন একমাত্র ব্যক্তি — নাজমুল হাসান পাপন। এ কারণে, পাঁচ দফায় একাধিকবার দায়িত্বে থাকা প্রথম ব্যক্তি হলেন আমিনুল। কিন্তু নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে সরকারের হস্তক্ষেপ, প্রতিদ্বন্দ্বীদের নাম প্রত্যাহার ইত্যাদি অভিযোগ উঠেছে। এই প্রবন্ধে আমরা সেই অভিযোগ-ঐতিহ্য, বাস্তবতা, প্রভাব ও ভবিষ্যত সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করব।
সূচনা: ক্রিকেট প্রশাসনে নির্বাচন ও মনোনয়ন ইতিহাস
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (BCB / বিসিবি) এর শাসন ও তত্ত্বাবধানে নির্বাচন পদ্ধতির ঐতিহ্য দীর্ঘ। বিভিন্ন সময়ে মনোনয়ন বা অপ্রত্যাহারযোগ্য হস্তক্ষেপ্রশ্নচিহ্ন এনে দিয়েছে।
৪ দফা পাপন: একক আধিপত্য
নাজমুল হাসান পাপন চার দফায় বিসিবি সভাপতি হন, হয় সরকার মনোনয়নের মাধ্যমে, হয় বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে — নির্বাচন না হয় বরাবরই।
পাপনের সময় সহ-সভাপতি পদেও বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন ফারুক আহমেদ ও শাখাওয়াত হোসেন।
বীজ থেকে উদ্ভব: আমিনুলের উদ্ভব
২০২৫ সালের ৩০ মে, প্রথমবার আমিনুলকে সভাপতি মনোনয়ন দেওয়া হয় (ইন্টারিম/মনোনয়িত পর্যায়ে) — সেই সময় বিতর্ক শুরু হয়।
তারপর, সচরাচর নির্বাচন হওয়া উচিত সময়ে—ক্লাব, জেলা, বিভাগ স্তরে—প্রতিকূলতা ও অভিযোগের মধ্যেও গত সোমবার অনুষ্ঠিত নির্বাচন শেষে তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হলেন।
নির্বাচন প্রক্রিয়া ও অভিযোগগুলোর বিশ্লেষণ
নির্বাচন কাঠামো সংক্ষিপ্ত
বিসিবি গঠনে সাধারণ তিনটি ক্যাটাগরি রয়েছে — বিভাগ ও জেলা (ক্যাটাগরি-১), ক্লাব (ক্যাটাগরি-২), এবং প্রাক্তন ক্রিকেটার / বিশেষ সংস্থা (ক্যাটাগরি-৩)।
প্রতিটি বিভাগের কাউন্সিলররা ভোটাধিকারী এবং তারা ২৫ জন পরিচালক নির্বাচন করেন। এরপর পরিচালকরা তাঁদের মধ্য থেকে সভাপতি ও সহ-সভাপতি নির্বাচন করেন।
অভিযোগের তালিকা
নিম্নলিখিত অভিযোগগুলো মিডিয়ায় ও সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের পক্ষ থেকে প্রকাশ পেয়েছে:
অভিযোগ সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ
সরকারি/উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ নির্বাচনকে ‘রাতের ভোটের’ সঙ্গে তুলনা করে প্রার্থীর অভিযোগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এমন সন্দেহ।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার প্রার্থীর সংখ্যা হঠাৎ করে কমে যায় — ২১ জন প্রার্থী নাম প্রত্যাহার করেন।
কাউন্সিলর ও সদস্য তালিকা পরিবর্তন / অ্যাডহক কমিটি জেলা ও বিভাগীয় অ্যাডহক কমিটিতে শেষ মুহূর্তে বদল আনার অভিযোগ, প্রার্থীদের অন্তর্ভুক্তি/বহিষ্কার প্রক্রিয়া সংকুচিত হওয়া।
ভয়ভীতি ও প্ররোচনা ক্লাব কাউন্সিলর, প্রার্থীদের প্রতি চাপ, ভয়ভীতি ইত্যাদির অভিযোগ।
নির্বাচনের স্বচ্ছতার অভাব সার্বিকভাবে অভিযোগ উঠেছে যে অধিকাংশ পদই সেখানেই প্রার্থী সরে গেছেন — নির্বাচন হচ্ছে ইভেন্ট নয়, দৃশ্য।
বিরোধী দৃষ্টিকোণ ও প্রতিক্রিয়া
আমিনুল নিজে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, বলেছেন “এখানে আমার কাছে (সরকারের) প্রভাব কিছু মনে হয়নি”
বলা হচ্ছে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীবের প্রভাব প্রচুর — নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে অনেক স্থানে তার পছন্দের প্রার্থীদের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তামিম ইকবালসহ কয়েক জন প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে গিয়েছেন।
একজন অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষক বলেছেন — “নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ব্যালট বাক্স ভরিয়ে দেওয়ার মতো কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে” — যা ‘রাতের ভোট’ অভিযোগকে উৎসাহিত করেছে।
শতাব্দীপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন: স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল শাসন কি সম্ভব?
কি শুধুই ক্রিকেট নেতৃত্বের জয়?
কেবল ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হওয়া যে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে, তা অসাধারণ নয়। যদি সেই জয় প্রক্রিয়াগত ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে শুধু একটি কর্ণধার বদল নয় — শাসন-দায়িত্ব ও বিশ্বাসবিচার পরিবর্তনই প্রশ্নবদ্ধ হয়।
নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও ক্রিকেটের প্রতি আস্থা
যদি নির্বাচনই সন্দেহাতীতভাবে চলতে না পারে, তা হলে সাধারণ ক্রিকেট সংগঠক এবং ক্লাব পর্যায়ের অংশগ্রহণকারীর আস্থা ক্ষুণ্ন হবে। সেই আস্থা ফিরে আনা কঠিন।
কীভাবে রুখে দেবে “নকল নির্বাচন”?
সংগঠনীয় স্বাধীনির্বাচন কমিশন গঠন
নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক ও মনিটরিং
প্রার্থীদের অবাধ ও নিরাপদভাবে প্রচার ও অংশগ্রহণের সুযোগ
নির্বাচন বিষয়ে আইনগত বাধ্যবাধকতা ও ফৌজদারি দায়বদ্ধতা
উদাহরণ ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ
তামিম ইকবালের প্রত্যাহার — বলেছিলেন, “নির্বাচন ফিক্সিংয়ে” অভিযোগ তুলে আত্মসফলভাবে নাম তুলে নিয়েছেন।
নর্তক আচরণ — বিভিন্ন বিভাগ ও জেলার অ্যাডহক কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় শেষ মুহূর্তে বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া — অনেক্লাব প্রতিনিধির কাছে এটি ‘শাসনীয় কলকব্জা’ হিসেবে দৃশ্যমান।
পাপন যুগের তুলনা — চার দফায় বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া সেই যুগে অনিয়ম অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক ও সমর্থনবাহী গোষ্ঠীর কথা অনেকটা স্বাভাবিক হিসেবে গৃহীত ছিল। বর্তমানে গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতার দাবি বেশি বেড়ে গেছে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও দিকনির্দেশনা
চ্যালেঞ্জ
ক্রিকেট বোর্ডের অভ্যন্তরীণ একতাবিধান
ক্লাব ও জেলা পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বার্থ
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে বিশ্বাসযোগ্যতা
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীর আস্থা পুনঃস্থাপন
দিকনির্দেশনা
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন
আলোচনাশীল গঠনমূলক সমালোচনার সুযোগ
ক্লাব ও জেলা স্তরের পেশাগত স্বচ্ছতা ও নিয়মাবলী প্রচলন
নির্বাচনের প্রতিটি ধাপ জনসমক্ষে প্রমাণসমর্থক করা
ডিজিটাল এবং মোবাইল মনিটরিং—ভোটগ্রহণ থেকে গণনা পর্যন্ত
উপসংহার ও মূল টেকওয়ে
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া, প্রার্থীদের পরবর্তী প্রত্যাহার, ভোটার ও কাউন্সিলরের নাম তালিকা পরিবর্তন — এসব ঘটনা মিলে বিসিবি নির্বাচনে স্বচ্ছতার প্রশ্নাকে অগ্রাহ্য করে দিচ্ছে। যদিও আমিনুল ইসলাম বুলবুল নিজে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “আমি সংবিধান ও আইন মেনে কাজ করেছি,”
প্রশ্ন থেকে যায় — স্বাধীন ও ন্যায্য নির্বাচন হবে কীভাবে নিশ্চিত?
ক্রিকেট বোর্ডের শাসন-গোষ্ঠীর পরিচালনায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বজায় রাখা অপরিহার্য। সভাপতির ব্যক্তিত্ব ও ইচ্ছার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচন প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা। যদি ক্রিকেট যেভাবে মাঠে সঠিক খেলা চায়, প্রশাসনেও সে মান বজায় নেয় — তবেই আস্থা ফিরবে, ও ক্রিকেট ঘিরে সরকারি অনিয়মের অভিযোগ থাকবে না।
❓ প্রশ্ন ও পাঠককে আহ্বান
আপনি কী মনে করেন, ক্রিকেট বোর্ড নির্বাচন সম্পূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে হতে পারে?
কী মাধ্যম বা সংস্কার হতে পারে যাতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাধ্যতামূলক হয়?
আপনার কাছে “নির্বাচন ফিক্সিং” বলতে কী বোঝেন — অভিজ্ঞতামূলক উদাহরণ থাকলে শেয়ার করুন।
আপনার মতামত গুরুত্বপূর্ণ — নিচে একটি মন্তব্য লিখুন ও আলোচনা শুরু করুন।

0 Comments