Advertisement

0

মহাকাশে ৯ মাস টিকে শ্যাওলা: বিজ্ঞানীদের অবাক করা আবিষ্কার

 

আজ শুক্রবার, ১৩ই অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮ই নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

মহাকাশে ৯ মাস টিকে শ্যাওলা: বিজ্ঞানীদের অবাক করা আবিষ্কার

মহাকাশে ৯ মাস টিকে শ্যাওলা! Hokkaido University-র গবেষণায় প্রকাশ—৮০% স্পোর অঙ্কুরিত। মহাকাশ কৃষি, জীবনধারা ও ভবিষ্যৎ অভিযানে কী বদল আনবে জানুন।

কল্পনা করুন—মহাকাশের ঘূর্ণায়মান ভ্যাকুয়াম, সূর্যের নির্মম UV রশ্মি, আর -১৫০° থেকে +১২০° সেলসিয়াসের তাপমাত্রা… যেখানে মানুষের জীবনের কোনো অস্তিত্ব কল্পনাও করা কঠিন। এমন পরিবেশে পৃথিবীর ক্ষুদ্র কিন্তু অসাধারণ এক উদ্ভিদ—শ্যাওলা (Moss)—টিকে গেল টানা ৯ মাস (২৮৩ দিন)!

জাপানের Hokkaido University–এর গবেষকদের এই অবাক করা সফলতা শুধু পৃথিবীর বিজ্ঞানের সীমানাই নয়, মহাকাশ অভিযানের ভবিষ্যৎকেও নতুন করে লিখছে। ক্ষুদ্র প্রাণী বা উদ্ভিদের মহাকাশ-সহনশীলতা নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে, তবে শ্যাওলার এভাবে বেঁচে থাকা বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে।

মহাকাশে ৯ মাস ধরে টিকে থাকা শ্যাওলার ছবি—চরম মহাকাশ পরিবেশে শ্যাওলার অবিশ্বাস্য জীবনীশক্তি
৯ মাসের মহাকাশ অভিযানে শ্যাওলার টিকে থাকা বিজ্ঞানীদের রীতিমতো চমকে দিয়েছে। কঠোর পরিবেশেও কীভাবে জীবন টিকে থাকতে পারে তার নতুন রহস্য উন্মোচন করল এই গবেষণা।

১. শ্যাওলা: পৃথিবীর ক্ষুদ্র কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী উদ্ভিদ

শ্যাওলা পৃথিবীর প্রাচীনতম উদ্ভিদগুলোর একটি। প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে জন্ম নেওয়া এই উদ্ভিদ আজও পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারে।

কেন শ্যাওলা এত শক্তিশালী?

  • এর স্পোর অত্যন্ত টেকসই

  • স্পোরে রয়েছে DNA-রক্ষাকারী প্রোটিন

  • পানিশূন্য অবস্থায়ও দীর্ঘ সময় ‘শীতনিদ্রা’ কাটাতে পারে

উদাহরণ

  • অ্যান্টার্কটিকায় ১৬০০ বছর পুরনো শ্যাওলা পুনরায় জীবিত করা হয়েছে

  • হিমালয়ের বরফঢাকা উচ্চতায়ও টিকে থাকতে দেখা গেছে

  • আগ্নেয়গিরির লাভার ওপরে সবচেয়ে আগে জন্মায় শ্যাওলা

এখন প্রশ্ন—এই শক্তিশালী উদ্ভিদের স্পোর কি মহাকাশেও বেঁচে থাকতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ! এবং তা রেকর্ড ৯ মাস।

২. গবেষণার পেছনের বিজ্ঞান: Hokkaido University-র মহাকাশ-মিশন

এই পরীক্ষার নেতৃত্ব দেন Tomomichi Fujita, জাপানের Hokkaido University–র উদ্ভিদ বিজ্ঞানী। তারা পৃথিবীর ল্যাবে প্রথমে পরীক্ষা করেন, তারপর প্রজাতিটি—

Species: Ceratodon purpureus

কে পাঠানো হয় ISS (International Space Station)–এর বাইরের মহাশূন্যে।

পরীক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো

  • সূর্যের UV-C রশ্মি

  • সম্পূর্ণ ভ্যাকুয়াম পরিবেশ

  • তাপমাত্রার ব্যাপক ওঠানামা

  • কোনো পানি বা বায়ুর অস্তিত্ব নেই

গবেষকরা ২০২২ সালে স্পোরগুলোকে ISS-এর বাইরের প্ল্যাটফর্মে স্থাপন করেন। সেগুলো সেখানে থাকে ২৮৩ দিন—অর্থাৎ টানা ৯ মাস!

৩. গবেষণার অবাক করা ফলাফল: ৮০% শ্যাওলা স্পোর অঙ্কুরিত

পৃথিবীতে ফেরত আনার পর দেখা যায়—

✔ ৮০% স্পোর জীবিত

✔ অনেক স্পোর অঙ্কুরিত হয়ে নতুন শ্যাওলায় পরিণত হয়েছে

গবেষকদের মতে, শ্যাওলার স্পোর মহাকাশে ১৫ বছর বা তারও বেশি সময় টিকে থাকতে পারে।

গবেষকের উক্তি

Fujita বলেন—
“এটি জীবনের সীমা নতুন করে নির্ধারণ করছে।”

এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে iScience জার্নালে।

৪. কেন এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ? মহাকাশ অভিযানে শ্যাওলার সম্ভাবনা

শ্যাওলা শুধু টিকে থাকার রেকর্ডই করছে না—এটি ভবিষ্যতের স্পেস কলোনাইজেশনের জন্য এক সম্ভাবনাময় সঙ্গী।

১. চাঁদ বা মঙ্গলে অক্সিজেন উৎপাদন

শ্যাওলা ফটোসিনথেসিসের মাধ্যমে অক্সিজেন তৈরি করতে পারে। মহাকাশে মানুষের টিকে থাকার জন্য এটি বড় সুবিধা।

২. মাটির মান উন্নয়ন

মঙ্গল বা চাঁদের মতো ধূলিময়, অনুর্বর পরিবেশেও শ্যাওলা প্রথম ধাপের জীব হিসেবে মাটি তৈরিতে সাহায্য করতে পারে।

৩. বিকিরণ (Radiation) থেকে সুরক্ষা

শ্যাওলা স্পোর UV রশ্মি সহ্য করতে পারে—এটি ভবিষ্যতের স্পেস ফার্মিং-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

৪. NASA ও SpaceX মিশনে ব্যবহার

হালকা, কম জায়গা লাগে, কম পানি চায়—তাই ভবিষ্যতের স্পেস শাটল বা মঙ্গল ঘাঁটিতে শ্যাওলা ব্যবহার সম্ভব।

 সীমাবদ্ধতা: সবকিছুই কি ইতিবাচক?

এত সফলতার পরও গবেষকরা কিছু চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছেন—

সম্ভাব্য সমস্যা

  • দীর্ঘদিন মহাকাশে থাকলে DNA ক্ষতি হতে পারে

  • UV রশ্মির দীর্ঘ প্রভাব এখনো পুরোপুরি জানা নয়

  • বর্ধিত বিকিরণে কিছু স্পোর মিউটেট হতে পারে

গবেষকরা বর্তমানে আরও দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষা চালাচ্ছেন।

ভবিষ্যতের লক্ষ্য: মহাকাশ কৃষিতে শ্যাওলার বিপ্লব

গবেষক দলের পরবর্তী পরিকল্পনা—

✔ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে আরও শক্তিশালী শ্যাওলা তৈরি

✔ মঙ্গল সিমুলেশনে আরও পরীক্ষা

✔ মহাকাশে পূর্ণাঙ্গ ‘মস ফার্ম’ তৈরি

ভবিষ্যতে মহাকাশ কৃষিতে শ্যাওলা হতে পারে এক বিপ্লবের নাম।

 মহাকাশ জয়ের পথে শ্যাওলা—এক নতুন নায়ক

মানুষ যখন চাঁদ ও মঙ্গল উপনিবেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছে, তখন শ্যাওলার মতো ক্ষুদ্র উদ্ভিদ সেই যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
৯ মাস টিকে থাকা শুধু বিজ্ঞান নয়—এটি মহাকাশে জীবনের সম্ভাবনা ও মানবজাতির ভবিষ্যতের আশা।

জীবন সত্যিই অদম্য। আর শ্যাওলা সেই প্রমাণ।

Dhaka News-এর বিজ্ঞান আপডেট পেতে আমাদের সঙ্গে থাকুন!

১. মহাকাশে শ্যাওলা কতদিন টিকে ছিল?

৯ মাস (২৮৩ দিন) ISS-এর বাইরের চরম পরিবেশে।

২. কোন প্রজাতির শ্যাওলা ব্যবহার করা হয়?

Ceratodon purpureus

৩. গবেষণায় কী দেখা গেছে?

প্রায় ৮০% স্পোর বেঁচে গেছে ও অঙ্কুরিত হয়েছে

৪. এর গুরুত্ব কী?

মহাকাশ কৃষি, অক্সিজেন উৎপাদন, মাটি তৈরি এবং ভবিষ্যৎ অভিযানে বড় ভূমিকা রাখবে।

৫. গবেষণাটি কোথায় প্রকাশিত হয়েছে?

জার্নাল iScience-এ।

Post a Comment

0 Comments