আজ সোমবার ৯রা অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৪ নভেম্বার ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২ জমাদিউস সানি ১৪৪৭ হিজরি
রাজউকের সতর্কবার্তা উপেক্ষা: ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের দুঃসহ বাস্তবতা
ঢাকায় রাজউক ঘোষিত অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৪২ ভবন ও রেট্রোফিটিংয়ের অপেক্ষায় ১৮৭ ভবন। শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ, বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও সমাধানের পথ বিশদ বিশ্লেষণে।
রাজউকের সতর্কবার্তা উপেক্ষা: ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের দুঃসহ বাস্তবতা
ঢাকায় রাজউক ঘোষিত অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৪২ ভবন ও রেট্রোফিটিংয়ের অপেক্ষায় ১৮৭ ভবন। শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ, বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও সমাধানের পথ বিশদ বিশ্লেষণে।
![]() |
রাজউকের জরিপে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত ঢাকার অসংখ্য ভবন এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে আগের অবস্থাতেই। সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে এই ভবনগুলো এখন শহরের মানুষের জন্য স্থায়ী ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। |
ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পরিদর্শন করছে কর্তৃপক্ষ; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো হল কাঠামো।
ঢাকা শহর একদিকে বিস্তৃত হচ্ছে, অন্যদিকে ভবনগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে ভাঙাচোরা মৃতফাঁদে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক যে ভবনগুলোকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে, তার বেশিরভাগই এখনো মানুষের মাথার ওপর ঝুলে থাকা মৃত্যুফাঁদ হয়ে টিকে আছে। বিশেষত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিতরেও ঝুঁকির মাত্রা ভয়ানক। মীর মশাররফ হোসেন হল, আল বেরুনী হলসহ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হল সেই ঝুঁকির তালিকার শীর্ষে। অথচ সেখানে প্রতিদিন শত শিক্ষার্থী বাস করছে।
২০২৩ সালের মার্চে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত জরিপে যেসব সরকারি ভবন ভেঙে ফেলা বা রেট্রোফিটিং করার সুপারিশ করা হয়েছিল, সেগুলোর অগ্রগতি এখনও শূন্যের কোঠায়। ভূমিকম্পের ঝুঁকি, আগুনের ঝুঁকি এবং দুর্বল নির্মাণমানের কারণে হাজার হাজার মানুষের জীবন বিপন্ন হলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অভিযোগের পাহাড়ে দাফন হয়ে আছে।
এই অনুসন্ধানী রিপোর্টে উঠে এসেছে ঢাকার ভবন নিরাপত্তা সংকট, কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং নাগরিকদের জন্য জরুরি করণীয়।
রাজউকের জরিপ: ঢাকার ভবনগুলো আসলে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
২০২৩ সালের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের চমকপ্রদ ফলাফল
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘আরবান রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের আওতায় রাজউক ২০২৩ সালের মার্চ মাসে যে জরিপ চালায়, তার ফলাফল ছিল ভয়াবহ।
মূল তথ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:
• রাজধানীতে ২১ লাখ ৪৫ হাজার ভবন
• এর ৪০ শতাংশ বড় ভূমিকম্পে ধসে পড়তে পারে (সাড়ে ৮ লাখ ভবন)
• ঢাকায় বহুতল ভবন ৭৫ হাজারের বেশি
• সরকারিভাবে নির্মিত নতুন ভবনের ৩৭ শতাংশও ঝুঁকিপূর্ণ
• ভবন ধস হলে সম্ভাব্য মৃত্যু ২ লাখ ১০ হাজার–৩ লাখ ১০ হাজার মানুষ
• রেট্রোফিটিংয়ের সম্ভাব্য খরচ ৬২ মিলিয়ন ডলার
যেসব ভবন ভাঙার সুপারিশ করা হয়েছিল
জরিপে মোট ৪২টি ভবনকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করে ভেঙে ফেলার সুপারিশ করা হয়। এই তালিকায় রয়েছে:
• জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি
• জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি
• পিজি হাসপাতালের তিনটি
• মাদ্রাসা বোর্ডের তিনটি
• শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মিত ৩০টি ভবন
এগুলো ভাঙার সুপারিশের পর তিন মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও আজও সেগুলো দাঁড়িয়ে আছে ভয়ংকর সতর্কবার্তার মতো।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবতা: শিক্ষার্থীরা কি মৃত্যুফাঁদে বাস করছে?
প্রশাসনের বক্তব্য: রেট্রোফিটিংই ‘বাস্তবসম্মত’ সমাধান
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ জানান, ভূমিকম্পের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী:
• বড় ধরনের কাঠামোগত সমস্যা পরিলক্ষিত হয়নি
• ভবনগুলো পুরোনো হওয়ায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন
• মীর মশাররফ হোসেন হল রেট্রোফিট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে
• ইউজিসি ও বুয়েটকে কাঠামোগত মূল্যায়নের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে
• অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত উভয় প্রস্তুতি গ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে
উপ-উপাচার্য বলেন, যেহেতু শিক্ষার্থীরা এখনও হলে অবস্থান করছে, তাই এই মুহূর্তে ভবন ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত নয়। পরিবর্তে রেট্রোফিট করাই ভালো সমাধান হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ: ঝুঁকি কি সত্যিই কম?
যদিও প্রশাসন বলছে বড় ঝুঁকি নেই, শিক্ষার্থীদের একাংশ মনে করছে —
• রাজউকের ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা হঠাৎ করে আসেনি
• পুরোনো অংশে ফাটল, আর্দ্রতা, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল অনেক আগে থেকেই আছে
• ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে
অনেকের প্রশ্ন: রেট্রোফিটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিলেও কাজ কবে শুরু হবে? আর সেই কাজ চলাকালে শিক্ষার্থীরা কোথায় থাকবে?
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা: সমন্বয়ের অভাবে আটকে প্রকল্প
বুয়েটের পরীক্ষার খরচ ও রিপোর্ট না পাওয়ার অভিযোগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী জানান, তারা ভবনের অবস্থান যাচাই করতে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ কমিটি ডাকেন।
• বুয়েট রাজউকের বিস্তারিত প্রতিবেদন চাইলে
• বিশ্ববিদ্যালয় রাজউককে একাধিকবার চিঠি দেয়
• কিন্তু রাজউক কোনো রিপোর্ট পাঠায়নি
• নিজেরা পরীক্ষা করতে গেলে বুয়েট জানান পরীক্ষা-খরচ ৪৫ লাখ টাকা
• এর জন্য ইউজিসিকে চিঠি দেওয়া হলেও অনুমোদন পায়নি
ফলে ঝুঁকিতে থাকা ভবনগুলো “অচলাবস্থার” মধ্যেই রয়ে গেছে।
রাজউকের অবস্থান: সতর্কবার্তা স্পষ্ট, কিন্তু বাস্তবায়ন ধীর
রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল লতিফ হেলালী বলেন:
• ঢাকায় ভবন নির্মাণে ন্যূনতম মানও বজায় রাখা হয় না
• এতে ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বেড়েছে
• বড় ভূমিকম্পে বিপর্যয় হবে কল্পনাতীত
বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বলেন:
• চারবার ভূমিকম্প ঢাকাকে সতর্কবার্তা দিচ্ছে
• ভবন নিরাপত্তা নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে
• ভেঙে ফেলা ও রেট্রোফিটিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে: নির্দেশ দেওয়া ছাড়া কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়?
ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি: বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ঢাকার মাটি, স্থাপনা ও জনঘনত্ব—তিনেই লুকিয়ে বিপদ
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে দেখা যায়:
• ঢাকার মাটি নরম এবং সেডিমেন্টারি
• ভূমিকম্প হলে কম্পনের তীব্রতা ২–৪ গুণ বাড়ে
• পুরোনো ভবনের ফাউন্ডেশন দুর্বল
• অনুমোদনবিহীন বহুতল ভবনের সংখ্যা হাজারের বেশি
• জনসংখ্যার ঘনত্ব পৃথিবীর অন্যতম বেশি
• ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধার ব্যবস্থার সক্ষমতা সীমিত
• সরু গলি ও ভুল নকশার কারণে উদ্ধার কাজ কঠিন হয়ে পড়বে
রেট্রোফিটিং কেন জরুরি?
রেট্রোফিটিং করলে —
• পুরোনো ভবন নতুন ভূমিকম্প কোডের মানে আনা যায়
• ভবন ভেঙে ফেলা ছাড়াই নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত হয়
• পরিবেশগত ক্ষতি কম হয়
• সময় ও খরচ ভাঙার তুলনায় অনেক কম
কিন্তু বাংলাদেশে রেট্রোফিটিং প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন হয়নি বললেই চলে।
বহু বছর ধরে বিশেষজ্ঞরা যে কারণগুলো দেখিয়ে আসছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
• নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার
• ভবন নকশা অনুমোদন ছাড়াই বহুতল নির্মাণ
• ভবন তদারকিতে দুর্বলতা
• ভূমি জোনিং ও বিল্ডিং কোড কার্যকর না হওয়া
• নিয়মিত পরিদর্শনের অভাব
• রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতি
• নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের দক্ষতার ঘাটতি
সমাধানের পথ: কী করলে ভবনগুলো নিরাপদ হতে পারে?
সরকার ও রাজউকের দায়িত্ব
• অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো অবিলম্বে সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত
• রেট্রোফিটিং প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন
• নতুন ভবন অনুমোদনে কঠোরতা
• পুরোনো ভবনের নিয়মিত পরিদর্শন
• বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে প্রয়োগ
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর করণীয়
• শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বিকল্প আবাসন ব্যবস্থা করা
• বুয়েটের কাঠামোগত মূল্যায়ন দ্রুত সম্পন্ন করা
• রেট্রোফিটিংয়ের পরিকল্পনা প্রকাশ করা
• ঝুঁকিপূর্ণ হল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ
নাগরিকদের করণীয়
• বাড়ি নির্মাণে কোড মেনে চলা
• পুরোনো ভবনের কাঠামোগত পরীক্ষা করা
• ভূমিকম্প নিরাপত্তা অনুশীলন
• নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধি
ঢাকার ভবন সংকট শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি মানবিক সংকট। প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্ত, প্রতিটি বিলম্ব ভবিষ্যতের প্রাণহানির সম্ভাবনা বাড়ায়। রাজউকেরিপোর্টগুলো শুধু কাগজে লিখে রাখা তথ্য নয়, এগুলো লাখো মানুষের জীবনরক্ষার সতর্কবার্তা।
আমাদের এখনই এমন একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন যেখানে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, রাজউক, বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক—সবাই একসঙ্গে কাজ করবে। কারণ ভূমিকম্প অপেক্ষা করে না, আর ভবন ধসে পড়লে দায় এড়ানোর সুযোগ থাকে না।
ঢাকার ভবন নিরাপত্তা নিয়ে আপনি কী মনে করেন? আপনার এলাকার ভবনগুলো কি রেট্রোফিটিংয়ের প্রয়োজন আছে? সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে এখনই এই প্রতিবেদনটি শেয়ার করুন এবং নিরাপদ নগর বিনির্মাণে অংশ নিন।
প্রশ্ন ১: ঢাকায় কতগুলো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ?
উত্তর: রাজউকের জরিপ অনুযায়ী সাড়ে ৮ লাখ ভবন বড় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে পড়তে পারে।
প্রশ্ন ২: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন হল ঝুঁকিপূর্ণ?
উত্তর: মীর মশাররফ হোসেন হল, আল বেরুনী হলসহ মোট তিনটি ভবন অতি ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে।
প্রশ্ন ৩: রেট্রোফিটিং কী?
উত্তর: এটি একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে পুরোনো ভবনকে ভূমিকম্প-প্রতিরোধী করে পুনরায় নিরাপদভাবে ব্যবহার করা যায়।
প্রশ্ন ৪: রাজউক কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?
উত্তর: মূলত প্রশাসনিক জটিলতা, সমন্বয়ের অভাব এবং বাজেট সংকটের কারণে পদক্ষেপ বিলম্বিত হচ্ছে।
প্রশ্ন ৫: নাগরিকরা কীভাবে নিজেদের ভবন নিরাপদ করতে পারেন?
উত্তর: বিশেষজ্ঞ দিয়ে কাঠামোগত মূল্যায়ন করানো, কোড অনুযায়ী মেরামত ও রেট্রোফিটিং করা জরুরি।

0 Comments