আজ বুধবার ১১ই অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৬শে নভেম্বর ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ, ৪ঠা জমাদিউস সানি ১৪৪৭ হিজরি
সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি: অর্থ, ফজিলত ও আত্মশুদ্ধির পথ
“সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি”—এ দোয়ার অর্থ, ফজিলত, গুরুত্ব, আমল, সুফল এবং আত্মশুদ্ধিতে এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত।
ইসলামে যিকির হচ্ছে আত্মার প্রশান্তি ও আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম সহজ মাধ্যম। এমন বহু যিকির রয়েছে, যা অল্প শব্দে বিশাল সওয়াবের দরজা খুলে দেয়। সেগুলোর মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যিকির হলো—
“সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।”
এটি তাসবিহ, তাওবা ও ইস্তিগফারের সম্মিলিত এক পরিপূর্ণ দোয়া। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহকে পবিত্র ঘোষণা করে, পাশাপাশি নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চায় এবং তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনের অঙ্গীকার করে।
১. দোয়ার শব্দ ও অর্থ (Meaning & Translation)
আরবি:
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
বাংলা উচ্চারণ:
সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি
বাংলা অর্থ:
“আমি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করি এবং তাঁর প্রশংসা করি। আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই এবং তাঁরই দিকে ফিরে যাই।”
এই দোয়ায় আল্লাহর মহিমা, বান্দার বিনয়, তাওবা এবং ক্ষমা প্রার্থনার সমন্বয় রয়েছে।
২. হাদিসে এই যিকিরের ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
"যে ব্যাক্তি প্রতিদিন ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ একশ’ বার বলবে, তার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতো বেশি হয়।"
—সহিহ মুসলিম
আরেক হাদিসে এসেছে—
“ইস্তিগফার হলো রিজিক বৃদ্ধি ও দুশ্চিন্তা দূর হওয়ার মাধ্যম।”
এ দোয়ায় যেহেতু তাসবিহ ও ইস্তিগফার উভয়ই রয়েছে, তাই এর ফজিলত দ্বিগুণ।
৩. কেন এই যিকির আত্মশুদ্ধির জন্য সবচেয়ে কার্যকর?
এই যিকির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আমল একত্রে করে—
তাসবিহ – আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা
তাহমীদ – আল্লাহর প্রশংসা করা
ইস্তিগফার – নিজের গুনাহের ক্ষমা প্রার্থনা
তাওবা – আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন
এই চারটি আমল মানুষের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, অহংকার দূর করে এবং আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
৪. কখন ও কতবার পড়া উত্তম?
এটি পড়ার নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই, তবে—
সকাল-সন্ধ্যার যিকিরে পড়া অত্যন্ত উত্তম
নামাজ শেষে পড়া যায়
রাতে ঘুমানোর আগে পড়া সুন্নাহসম্মত
গাড়ি, অফিস, বাসা, রান্নাঘর—যেকোনো স্থানে পড়া যায়
বেশি পড়লে আল্লাহর রহমত বাড়ে
একজন ব্যস্ত মানুষ প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার পথে ১০০ বার এই যিকির পড়লে, তার জন্য বিশাল সওয়াব লিখে দেওয়া হবে।
৫. মানসিক প্রশান্তি ও দুশ্চিন্তা দূরীকরণে এ দোয়ার উপকারিতা
যারা দুশ্চিন্তা, হতাশা বা মানসিক অশান্তিতে ভুগছেন, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর যিকির।
এর উপকারিতার মধ্যে রয়েছে—
মনের ভার লাঘব
চিন্তা ও চাপ কমানো
আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি
হৃদয়ের প্রশান্তি
পাপের বোঝা হালকা অনুভব
কোরআনে আল্লাহ বলেন—
“স্মরণে তো আল্লাহর, মন শান্তি পায়।”
(সূরা রা'দ, ২৮)
৬. দৈনন্দিন জীবনে এই যিকির প্রয়োগের বাস্তব উদাহরণ
পরীক্ষার আগে
একজন ছাত্র পরীক্ষা দিতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকলে এ দোয়া পড়লে মন স্থির হবে।
রাগের মুহূর্তে
রাগ কমাতে এ তাসবিহ পড়লে হৃদয় শান্ত হয়।
বিপদে পড়লে
কেউ আর্থিক বা পারিবারিক সমস্যায় পড়লে ইস্তিগফার বেশি পড়লে আল্লাহ সহজ পথ করে দেন।
গাড়ি চালানোর সময়
রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমার জিহ্বা যেন আল্লাহর যিকিরে সদা তরতাজা থাকে।”
গাড়ি চালানোর সময় এ দোয়া চিত্তকে শান্ত রাখে।
বিশ্লেষণ: আধুনিক জীবনের চাপে এই যিকির কেন প্রয়োজন?
আজকের ব্যস্ত জীবনে—মানসিক চাপ, হতাশা, অশান্তি
সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক সমস্যার বোঝা
এমন অনেক কিছুর মাঝে মানুষ অন্তর্দহন অনুভব করে।
এই দোয়া মানুষকে—
✔ আধ্যাত্মিক শক্তি দেয়
✔ আল্লাহর উপর ভরসা বাড়ায়
✔ গুনাহ থেকে মুক্তির পথ দেখায়
✔ হৃদয়কে আলোকিত করে
তাই আধুনিক যুগে এই যিকির মানুষের জন্য একটি সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসা।
“সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি” — সংক্ষিপ্ত হলেও অত্যন্ত গভীর অর্থবহ যিকির। এতে রয়েছে আল্লাহর প্রশংসা, তাঁর প্রতি বিনয়, ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং তাঁর দিকে ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা। প্রতিদিন অল্প সময় ব্যয় করে এই দোয়া পড়লে জীবন বদলে যেতে পারে, হৃদয় পেতে পারে প্রকৃত শান্তি।
১. এই দোয়া পড়ার নির্দিষ্ট সময় আছে কি?
না, যেকোনো সময় পড়া যায়। তবে সকাল–সন্ধ্যায় পড়া খুবই উত্তম।
২. কতবার পড়া উচিত?
নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। যত বেশি পড়বেন, তত বেশি সওয়াব পাবেন।
৩. নারীরা কি মাসিকের সময় এ দোয়া পড়তে পারেন?
জি হ্যাঁ, যিকির–দোয়া পড়তে কোনো বাধা নেই।
৪. দোয়াটি কি নামাজের শেষে পড়া যায়?
হ্যাঁ, নামাজের পর পড়া অত্যন্ত কল্যাণকর।
৫. এটি কি রিজিক বৃদ্ধিতে সহায়ক?
হাদিসে এসেছে, ইস্তিগফারিজিক বৃদ্ধি করে। তাই এ দোয়া পড়লে কল্যাণ আসে।

0 Comments