ঢাবি ১৪ দিন বন্ধ: ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়নে হল ছাড়ার নির্দেশ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৪ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকি মূল্যায়ন ও হল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কারণে রোববার ৫টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল খালি করার নির্দেশ এবং ভূমিকম্প-পরবর্তী নিরাপত্তা মূল্যায়ন বিষয়ে জরুরি সিদ্ধান্তের সংবাদচিত্র।
![]() |
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৪ দিন বন্ধ ঘোষণা, রোববার বিকালের মধ্যে আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কর্তৃপক্ষ ভূমিকম্প-উত্তর সম্ভাব্য ঝুঁকি, ভবনের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক ট্রমার বিষয় বিবেচনায় আগামী ২৩ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪ দিনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে দেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা—রোববার বিকেল ৫টার মধ্যেই শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল খালি করতে হবে।
এই সিদ্ধান্ত ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ, ভূমিকম্প-সংবেদনশীল অঞ্চলে বসবাসকারী লাখো শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার দায়িত্ব বিবেচনা করেই নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সিন্ডিকেট সদস্যরা। Dhaka News আজ জানাচ্ছে ঢাবির এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ, বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞ মতামত, ঝুঁকি মূল্যায়নের ব্যাখ্যা এবং শিক্ষার্থীদের ওপর এর প্রভাব।
ঢাবির জরুরি সিন্ডিকেট সভা: কোথা থেকে শুরু হলো এই সিদ্ধান্ত?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জনসংযোগ দফতরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়—শনিবার (২২ নভেম্বর) ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয় সিন্ডিকেটের জরুরি সভা।
সভায় উপস্থিত ছিলেন:
• বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্যবৃন্দ
• চিকিৎসা অনুষদের ডিন
• ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ
• পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক
• ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক
• প্রধান প্রকৌশলী
সভার আলোচনায় মূল ফোকাস ছিল—ভূমিকম্পের পর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবনগুলোর কাঠামোগত ঝুঁকি বিশ্লেষণ।
কেন ঢাবি বন্ধ? কারণগুলো কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো শতবর্ষী ভবন। ভূমিকম্পের সামান্য প্রভাবও এমন ভবনে বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। বৈঠকে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতর ও প্রকৌশল শাখার যৌথ মূল্যায়নে উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—
১. ভূমিকম্প-উত্তর সম্ভাব্য কাঠামোগত দুর্বলতা
অনেক হলেই বিভিন্ন জায়গায় চির ধরার লক্ষণ দেখা গেছে। যদিও তা মারাত্মক না, তবে উপেক্ষা করলে বিপদ বাড়তে পারে।
২. সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী ঝুঁকি নিরূপণে অন্তত ১০–১৪ দিন সময় লাগবে।
৩. শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তা
হঠাৎ ভূমিকম্পে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
রাতে হলে ঘুমাতে ভয় পাওয়া, ভবন ভেঙে পড়ার গুজব—এসব মনস্তাত্ত্বিক চাপও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
৪. প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ
বুয়েট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন—কিছু হল অবিলম্বে আংশিক সংস্কারের আওতায় আনতে হবে।
এর আগে শিক্ষার্থীদের সরানো জরুরি। একই কারণে হল খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হল ছাড়ার নির্দেশ: কেন এত দ্রুত?
অনেকেই বলছেন—হঠাৎ কেন রোববার ৫টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ?
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ অনুযায়ী—
• দ্রুত ঝুঁকি চিহ্নিত করতে হলে ভবন পুরোপুরি খালি রাখতে হবে
• শিক্ষার্থীরা হলে থাকলে কাঠামোগত পরীক্ষা করা সম্ভব নয়
• নিরাপত্তার দিক থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন জানায়—“আমরা কাউকে আতঙ্কিত করতে চাই না। তবে নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই।”
কোন কোন হল সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকতে পারে?
অফিশিয়ালি কোনো তালিকা প্রকাশ হয়নি। তবে ঢাবির প্রকৌশল দফতরের একাধিক সূত্র বলছে—
• কিছু পুরনো হলের সিঁড়ি ও ওয়াল জয়েন্টে ক্ষুদ্র ফাটল দেখা গেছে
• নাহিদ ভবন, শামসুন্নাহার, জগন্নাথ হল—এই এলাকাগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে
• কয়েকটি ব্লকে সংস্কারের প্রয়োজন হতে পারে
বিশ্ববিদ্যালয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো হলের নাম নিশ্চিত করেনি, যাতে গুজব না ছড়ায়।
ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত: ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—
• সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকবে
• ইতোমধ্যে যেসব পরীক্ষা ঘোষিত ছিল, সেগুলো নতুন করে তারিখ নির্ধারণ করে জানানো হবে
• অনলাইন একাডেমিক কার্যক্রম চালু রাখা হবে কি না—বিষয়টি পরবর্তী বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হবে
শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে—“সেশনজট যেন না হয়, সে দিকটিও বিবেচনায় রয়েছে।”
ভূমিকম্পে ঢাবির ভবন কেন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
কারণ ১: পুরনো অবকাঠামো
ঢাবির অধিকাংশ হল ও বিভাগীয় ভবন ৫০–১০০ বছর আগের নির্মাণ।
তখনকার নির্মাণ কোড ছিল এখনকার তুলনায় অনেক কম উন্নত।
কারণ ২: ঢাকার ভূমিকম্প-সংবেদনশীল অঞ্চল
গ্রেট মেঘনা ফল্টের খুব কাছে হওয়ায় ঢাকায় মাঝারি ভূমিকম্পও বড় ক্ষতি করতে পারে।
কারণ ৩: জনসংখ্যার চাপ
এক কক্ষে ৬–১২ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকে, ফলে ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে।
কারণ ৪: রক্ষণাবেক্ষণের অভাব
বছরের পর বছর মেইনটেন্যান্স কম হওয়ায় ছোট ক্ষতিও সময়ের সাথে বড় হয়।
শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া: সামাজিক মাধ্যমে ট্রেন্ড
ঢাবির এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর—
• ফেসবুক ও এক্স–এ (#DhakaUniversity, #DUHallEvacuation) ট্রেন্ড
• হল ছাড়ার নির্দেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
• অনেকে বলছেন হঠাৎ সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়তে পারেন দূরদূরান্তের শিক্ষার্থীরা
• কেউ কেউ নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য প্রশাসনকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন
একজন শিক্ষার্থী লিখেছেন—
“হঠাৎ হল ছাড়ার নির্দেশে সমস্যা হচ্ছে, কিন্তু নিরাপত্তার কথা ভেবে সিদ্ধান্তটা ঠিকই।”
বিশেষজ্ঞ মতামত: সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসংগত?
বুয়েটের ভূমিকম্প গবেষক একটি অনানুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন—
“একটি ভবনের ঝুঁকি সঠিকভাবে বুঝতে কমপক্ষে ৭–১০ দিন সময় লাগে। এর আগে পরীক্ষা করলে ভুল রেজাল্ট আসতে পারে। তাই হল খালি করাই সঠিক সিদ্ধান্ত।”
একজন নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন—
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বৃহত্তম আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে ঝুঁকি সামান্য হলেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবে? বিকল্প ব্যবস্থা কী?
ঢাবি প্রশাসন জানিয়েছে—
• জরুরি হলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা অস্থায়ীভাবে থাকতে পারবেন
• প্রয়োজন হলে আলাদা সাপোর্ট ডেস্ক থাকবে
• ছাত্র-ছাত্রীদের প্রয়োজনে পরিবহন ব্যবস্থা বিবেচনায় রাখা হবে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বলছে—“কোনো শিক্ষার্থী যেন সমস্যায় না পড়ে, আমরা প্রশাসনের পাশে আছি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও শিক্ষা কার্যক্রমে প্রভাব
১৪ দিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকা মানে—
• গবেষণা কার্যক্রম ধীরগতিতে চলবে
• সেশন ক্যালেন্ডার পেছানোর সম্ভাবনা
• আন্তর্জাতিক একাডেমিক লিয়াজোঁতে বাধা
• সাংস্কৃতিক ও সংগঠনগুলোর কর্মসূচি স্থগিত
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে—
“দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি যাতে না হয়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।”
ঢাবির আগের অভিজ্ঞতা: এই প্রথম নয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন সময়ে—
• রাজনৈতিক অস্থিরতা
• প্রাকৃতিক দুর্যোগ
• করোনাকাল
• নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ
এসব কারণে একাধিকবার বন্ধ ছিল।
তবে ভূমিকম্প-পরবর্তী ঝুঁকি মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে এই ধরনের সিদ্ধান্ত এবারই প্রথম।
ঢাবি কেন ১৪ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে?
ভূমিকম্প-পরবর্তী ভবন ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে সময় লাগবে বলে।
শিক্ষার্থীদের কি রোববারের মধ্যেই হল ছাড়তে হবে?
হ্যাঁ। রোববার বিকাল ৫টার মধ্যে হল খালি করার নির্দেশ রয়েছে।
ক্লাস ও পরীক্ষা কি পুরোপুরি বন্ধ?
৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ। নতুন তারিখ পরে জানানো হবে।
অনলাইন ক্লাস কি চালু হবে?
এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই।
হলগুলো কি ঝুঁকিপূর্ণ?
কিছু জায়গায় ফাটল দেখা গেছে, তবে ব্যাপক ক্ষতি নয়। পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য হল খালি করতে হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকস্মিক ১৪ দিনের ছুটি এবং হল খালি করার নির্দেশকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এটি সম্পূর্ণ প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ঝুঁকি নেওয়া যায় না।
আগামী দুই সপ্তাহে ভবন মূল্যায়ন, সংস্কার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে যে উদ্যোগ নেওয়া হবে, তার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ একাডেমিক কার্যক্রমের গতি। Dhaka News এ বিষয়ে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আপডেট আপনাদের সামনে তুলে ধরবে।
ঢাবি শিক্ষার্থী বা অভিভাবক? সর্বশেষ আপডেট, নোটিশ, বিশ্লেষণ ও ব্রেকিং নিউজ দ্রুত পেতে এখনই Dhaka News বুকমার্ক করুন।
এই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদটি বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন এবং জানিয়ে দিন—হল ছাড়ার নির্দেশ নিয়ে আপনার মতামত কী?

0 Comments