Advertisement

0

পুলিশি হামলায় উত্তপ্ত শাহবাগ অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে প্রাথমিক শিক্ষকরা



 পুলিশি হামলায় উত্তপ্ত শাহবাগ: অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে প্রাথমিক শিক্ষকরা

দশম গ্রেডসহ তিন দফা দাবিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা শাহবাগে পুলিশের হামলার পর অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা কর্মবিরতিতে: দাবির পেছনে ক্ষোভ, পুলিশের হামলায় উত্তপ্ত শাহবাগ

ঢাকার শাহবাগে পুলিশের বাধা ও জলকামানের মুখে তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ব্যানার হাতে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

ঢাকার শাহবাগে পুলিশের বাধা ও জলকামানের মুখে তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ব্যানার হাতে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

বাংলাদেশের শিক্ষা অঙ্গন আবারও অস্থির।

দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা শনিবার বিকালে রাজধানীর শাহবাগে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। এর জের ধরে তারা রবিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ঘোষণা দিয়েছেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. শামছুদ্দিন মাসুদ জানিয়েছেন—

“দাবি বাস্তবায়ন ও পুলিশের হামলার প্রতিবাদে আগামীকাল থেকে শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচির পাশাপাশি সারা দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি চলবে।”

 দাবি তিনটি কী ছিল?

সহকারী শিক্ষকদের তিন দফা দাবি দীর্ঘদিনের পুরনো বিষয়। সংক্ষেপে তা হলোঃ

সহকারী শিক্ষকদের জন্য দশম গ্রেড প্রদান।

১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সমস্যার সমাধান।

শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির নিশ্চয়তা।

শিক্ষকদের দাবি—প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে তারা দেশের মেরুদণ্ডের অংশ, অথচ তাদের গ্রেডভিত্তিক অবস্থান এখনও বৈষম্যপূর্ণ।

 ঘটনার সূচনা: শাহবাগে পদযাত্রা ও পুলিশের বাধা

শনিবার সকাল থেকেই সহকারী শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন।

পরে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে তারা “কলম সমর্পণ পদযাত্রা” শুরু করেন শাহবাগের উদ্দেশে। কিন্তু পুলিশ ব্যারিকেড তৈরি করে তাদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশ প্রথমে মাইকে হুঁশিয়ারি দেয়, এরপর শিক্ষকরা ব্যানার উঁচিয়ে এগোলে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। এতে কয়েকজন শিক্ষক আহত হন এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

 পুলিশের বক্তব্য: "শিক্ষকরা প্রথমে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেছেন"

অন্যদিকে শাহবাগ থানার এক কর্মকর্তার দাবি—

“বিকাল ৪টার দিকে আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনার দিকে অগ্রসর হয়। বাধা দিলে তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে, এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।”

পুলিশের ভাষ্যমতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাধ্য হয়ে সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করা হয়।

 শিক্ষকদের ক্ষোভ ও বঞ্চনার ইতিহাস

বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই বৈষম্যের শিকার।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষকদের তুলনায় প্রাথমিক পর্যায়ের সহকারী শিক্ষকরা এখনো নবম বা দশম গ্রেডে পৌঁছাতে পারেননি, যদিও তারা একই জাতীয় শিক্ষানীতির আওতায় কাজ করেন।

২০১৫ সালে Pay Scale Reformation Commission তাদের জন্য কিছু সুবিধা প্রস্তাব করলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে আজকের আন্দোলন তাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

শিক্ষা নীতি বিশ্লেষক ড. হাফিজুর রহমান বলেন—

“বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা হলো ভিত্তি। কিন্তু সেই ভিত্তির শিক্ষক যদি অসন্তুষ্ট হন, তাহলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব। প্রশাসনিক ধীরগতি ও নীতিগত অস্পষ্টতার কারণে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, সহকারী শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি পূরণে সরকার দ্রুত আলোচনার টেবিলে না এলে, এর প্রভাব আগামী বছরের পিএসসি পরীক্ষাসহ সামগ্রিক শিক্ষার গতি ব্যাহত করবে।

 শিক্ষকদের কণ্ঠে হতাশা ও প্রতিবাদ

শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ব্যাপক। মো. রফিকুল ইসলাম, একজন শিক্ষক, বলেন—

“আমরা শ্রেণিকক্ষে শিশুদের শেখাই ন্যায্যতা কী, অথচ নিজেরাই বঞ্চিত। আজ আমরা কলম নামাতে বাধ্য হয়েছি।”

অন্যদিকে নারী শিক্ষক সুমনা বেগম বলেন,

“আমরা শিক্ষাবান্ধব সরকার চাই, কিন্তু শিক্ষকবিরোধী পদক্ষেপ মেনে নেব না।”

 সরকারের নীরবতা: আলোচনার সুযোগ আছে কি?

এ ঘটনায় এখনো প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় শিগগিরই একটি টাস্কফোর্স গঠন করে দাবি বিবেচনা করবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই আন্দোলন যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে দেশের প্রায় ৬৫ হাজার বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ হয়ে যাবে, যা প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ভয়াবহ সংকেত।

 আগামী কর্মসূচি: শহীদ মিনারে অবস্থান ও পূর্ণদিবস কর্মবিরতি

প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি জানিয়েছে—

রবিবার থেকে শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি চলবে এবং একই সঙ্গে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালিত হবে।

তারা দাবি না মানা পর্যন্ত কর্মসূচি অনির্দিষ্টকাল চলবে।

 আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও শিক্ষা সংস্কারের প্রশ্ন

বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে UNESCO ও UNICEF একাধিক প্রতিবেদনে বলেছে—

“শিক্ষকদের বেতন ও পদোন্নতি কাঠামো সুষ্ঠু না হলে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।”

তাই এই আন্দোলন শুধুমাত্র জাতীয় ইস্যু নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠছে।

কেন শিক্ষকরা দশম গ্রেড চান? (তথ্য বিশ্লেষণ)

বিষয় বর্তমান অবস্থা শিক্ষকদের দাবি

বেতন গ্রেড ১৩ বা ১৪ গ্রেড ১০ গ্রেড

পদোন্নতি সীমিত শতভাগ বিভাগীয়

উচ্চতর স্কেল ১২ বছর পর ১০ ও ১৬ বছরে উচ্চতর

প্রশিক্ষণ সুযোগ সীমিত বাজেট বাধ্যতামূলক ও অর্থসহকারে

 সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া

ফেসবুক ও এক্স (টুইটার)-এ “#শিক্ষকের_ন্যায্যতা” এবং “#Give10thGradeNow” হ্যাশট্যাগে হাজারো পোস্ট ভাইরাল হয়েছে।

অনেকে লিখেছেন—

“যারা দেশের ভবিষ্যৎ গড়ছেন, তাদের জন্য রাস্তায় নামতে হচ্ছে—এটাই পরাজয়।”

 সম্ভাব্য সমাধান কী হতে পারে?

বিশেষজ্ঞরা তিনটি প্রস্তাব দিয়েছেনঃ

সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত আলোচনার টেবিল খোলা

শিক্ষকদের দাবির যৌক্তিক অংশগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন

একটি স্থায়ী শিক্ষক গ্রেড কমিশন গঠন করা

প্রশ্ন ১: শিক্ষকদের মূল দাবি কী?

উত্তর: তারা দশম গ্রেডে বেতন, উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি এবং শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির নিশ্চয়তা চান।

প্রশ্ন ২: কেন তারা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে গেছেন?

উত্তর: শাহবাগে পুলিশের হামলা এবং দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতিবাদস্বরূপ তারা কর্মবিরতি ঘোষণা করেছেন।

প্রশ্ন ৩: এই কর্মবিরতি কতদিন চলবে?

উত্তর: দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ অনির্দিষ্টকাল চলবে।

প্রশ্ন ৪: সরকারের প্রতিক্রিয়া কী?

উত্তর: এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি, তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রে আলোচনার ইঙ্গিত রয়েছে।

প্রশ্ন ৫: এতে শিক্ষার উপর কী প্রভাব পড়বে?

উত্তর: প্রায় ৬৫ হাজার বিদ্যালয়ে পাঠদান ব্যাহতে পারে, যা প্রাথমিক শিক্ষার মানে বড় ধাক্কা দেবে।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা আজ এক সঙ্কটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে।

শিক্ষকদের আন্দোলন কেবল বেতন নয়—এটি সম্মান, ন্যায্যতা ও শিক্ষার মান রক্ষার লড়াই। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত সংলাপে বসে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা।

 শিক্ষা সবার অধিকার—তাদের ন্যায্য দাবি শুনতে হবে এখনই।

 সচেতন নাগরিক হিসেবে এই সংবাদটি শেয়ার করুন এবং শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ান।

Post a Comment

0 Comments