Advertisement

0

বিজয় দিবসে জাতির উদ্দেশে ভাষণ: নির্বাচন ও জুলাই সনদের গণভোটের আহ্বান

 বিজয় দিবসে জাতির উদ্দেশে ভাষণ: চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি, নির্বাচন ও জুলাই সনদের গণভোটের আহ্বান

ড. ইউনূসের পূর্ণাঙ্গ ভাষণ: বিজয়ের দিনে গণতন্ত্রের পথে ‘ফ্যাসিস্টেররিস্টদের’ শেষ বাধা অপসারণের ডাক

 মহান বিজয় দিবস-২০২৫ উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সংস্কার, ওসমান হাদির ওপর হামলা এবং ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে তার পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য।

বিজয়ের আলোয় গণতন্ত্রের নতুন শপথ

মহান বিজয় দিবস-২০২৫ উপলক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছেন। আজ সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন, বিটিভি নিউজ এবং বাংলাদেশ বেতার একযোগে তার ভাষণ সম্প্রচার করে। প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণের শুরুতে দেশের জনগণ ও বিশ্বজুড়ে থাকা সকল বাংলাদেশিকে বিজয় দিবসের উষ্ণ শুভেচ্ছা জানান।

বিজয় দিবসে জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ফ্যাসিস্ট টেররিস্টদের হুঁশিয়ারি ও নির্বাচন-গণভোটের আহ্বান জানাচ্ছেন
মহান বিজয় দিবসে জাতির উদ্দেশে ভাষণে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ফ্যাসিস্ট টেররিস্টদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তুলে ধরে আসন্ন নির্বাচন ও জুলাই সনদের গণভোটে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।


তিনি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন একাত্তরের লাখো শহীদ ও বীর যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ, যার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বিগত বছরগুলোতে সেই স্বাধীনতার সূর্য স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদে ম্লান হয়েছিল। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবারও বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছে। তিনি উন্নত ও সুশাসিত বাংলাদেশের ভিত গড়তে চলমান সংস্কার কর্মসূচির সফল পরিসমাপ্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

 শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলা: গণতন্ত্রের ওপর আঘাতের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি

ভাষণের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস সম্প্রতি জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনাটি তুলে ধরেন। গভীর বেদনার সঙ্গে তিনি এটিকে শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং “বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত” এবং “গণতান্ত্রিক পথচলার ওপর আঘাত” বলে অভিহিত করেন।

সরকারের অবস্থান: সরকার এই ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ওসমান হাদির উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছে।

জিরো টলারেন্স নীতি: ড. ইউনূস দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত "পরাজিত শক্তি ফ্যাসিস্টেররিস্টদের" কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, "ভয় দেখিয়ে, সন্ত্রাস ঘটিয়ে বা রক্ত ঝরিয়ে এই দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।"

সংযমের আহ্বান: তিনি জনগণকে অপপ্রচার বা গুজবে কানা দেওয়ার এবং ঐক্যবদ্ধভাবে ফ্যাসিস্টেররিস্টদের মোকাবেলা করার আহ্বান জানান।

 তরুণদের সুরক্ষা এবং পরাজিত শক্তির শেষ চেষ্টা

প্রধান উপদেষ্টা তরুণ প্রজন্মের ভূমিকাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া পরাজিত শক্তিরা বুঝে গেছে যে তরুণ যোদ্ধারা তাদের পুনরুত্থানের পথে প্রধান বাধা।

বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণ: ড. ইউনূস বলেন, এই অস্ত্রহীন, ভীতিহীন তরুণদের নিয়ে পরাজিত শক্তির সাংঘাতিক ভীতি। তাদের লক্ষ্য হলো নির্বাচনের আগেই পথের বাধাগুলি সরিয়ে ফেলা। নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক বন্ধু ও সমর্থন জোগানো কঠিন হবে, তাই তারা নির্বাচনের আগেই ফিরে আসা নিশ্চিত করতে চায়। এই চোরাগোপ্তা হামলা তারই একটি রূপ।

ড. ইউনূস দেশের সবাইকে তরুণদের রক্ষা করার এবং নির্বাচনের বাকি দুই মাসকে উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ করে তোলার আহ্বান জানান, যাতে সব রকমের হিংসা, কোন্দল থেকে দেশকে বাঁচানো যায়।

 খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও 'অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি' ঘোষণা

ড. মুহাম্মদ ইউনূস অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়েও কথা বলেন। তিনি এটিকে "উদ্বেগের বিষয়" হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরেন।

সরকারি ঘোষণা: বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতি তার অবিচল অঙ্গীকার এবং জনগণের শ্রদ্ধার প্রতি সম্মান জানিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (VIP) হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।

চিকিৎসা সহযোগিতা: সরকারের পক্ষ থেকে তার পরিবারের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে।

ঐতিহাসিক বিচার, সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তন

দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে তিনটি বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে, সেগুলোর বিস্তারিত অগ্রগতি তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা।

. জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার ও রায়

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক একটি মামলারায় ইতোমধ্যেই ঘোষিত হয়েছে।

রায় ঘোষণা: ট্রাইব্যুনাল স্বাধীন ও স্বচ্ছ প্রমাণভিত্তিক বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের প্রধানির্দেশদাতা হিসেবে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন।

প্রত্যাবাসনের অনুরোধ: পলাতক শেখ হাসিনা এবং অপর আসামি আসাদুজ্জামান খানকে দেশে ফেরানোর জন্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।

 জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার নিশ্চিত করার জন্য জুলাই জাতীয় সনদ আদেশ আকারে জারি করেছে।

নাগরিকদের অনুমোদন: এই সনদ বাস্তবায়নে এখন জনগণের অনুমোদন নেওয়ার পালা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে এই জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

ভবিষ্যৎ পথরেখা: এই গণভোটের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে নতুন বাংলাদেশের চরিত্র, কাঠামো ও অগ্রযাত্রার গতিপথ।

. বিচার বিভাগ ও পুলিশ কমিশনের স্বাধীনতা

একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিচার বিভাগে যুগান্তকারী সংস্কার আনা হয়েছে।

বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা: বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এটিকে স্বতন্ত্র প্রশাসনিকাঠামো দিয়ে পৃথক সচিবালয় গঠন করা হয়েছে—যা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা সংস্কারের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক।

পুলিশ বাহিনীর সংস্কার: পুলিশ বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করা হয়েছে।

মানবাধিকার কমিশন: ফ্যাসিবাদী শাসনামলের আজ্ঞাবহ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলুপ্ত করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করা হয়েছে।

 ঐতিহাসিক নির্বাচন ও প্রবাসী ভোটাধিকার: দুটি ভোট, শতবর্ষের প্রভাব

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন ও গণভোটকে "বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত" হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা।

ভোটের পবিত্রতা: তিনি বলেন, ভোট কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণে নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ। দেশের মালিকানা জনগণের হাতে, আর সেই মালিকানারই স্বাক্ষর হলো তাদের ভোট।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান: রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তার উন্মুক্ত আহ্বান, তারা যেন একে অপরকে প্রতিযোগী হিসেবে দেখেন, শত্রু হিসেবে নয়। তিনি জোর দেন যে ভোট বাক্স ডাকাতি করবে তারা দেশের মানুষের স্বাধীনতা হরণকারী ও নাগরিকের দুশমন।

প্রশাসনের রদবদল: নির্বাচনকে কার্যকর ও নিরপেক্ষ করতে সরকার প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনে বেশ কিছু রদবদল এনেছে, যা করা হয়েছে কেবল দক্ষতা, যোগ্যতা এবং পেশাগত সক্ষমতার ভিত্তিতে।

প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোট: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সক্রিয় উদ্যোগে প্রথমবারের মতো লাখ লাখ প্রবাসী এবার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে যাচ্ছেন—যা প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি সম্মান।

 ভোট রক্ষা মানে দেশ রক্ষা

ড. ইউনূস তার ভাষণের সমাপ্তি টানেন দেশের মালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্র রক্ষার আহ্বানের মাধ্যমে।

বিশেষ বার্তা: তিনি মনে করিয়ে দেন, এবারের নির্বাচন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই দিনে এবার দুটি ভোট—একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের ভোট, আরেকটি গণভোট, যার প্রভাব হবে শতবর্ষব্যাপী।

ভোট রক্ষা করুন, দেশকে রক্ষা করুন! প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের এই ঐতিহাসিক ভাষণের মূল বার্তা হলো—আপনার একটি ভোট আগামী দিনেরাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করবে। দেশের মালিকানা আপনার হাতে। আপনি কি জুলাই সনদের সংস্কার কাঠামোকে এগিয়ে নিতে চান? তাহলে অবশ্যই ভোট দিন! এই বিষয়ে আপনার মতামত কী? কমেন্ট বক্সে আপনার গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণটি আমাদের জানান এবং এই ঐতিহাসিক তথ্যটি সবার মাঝে শেয়ার করুন।

Post a Comment

0 Comments