Advertisement

0

মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া কেন গুরুতর: কর্টিসল, লিভার ও রোগের সংযোগ। বিশেষজ্ঞের পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন

 

আজ সোমবার, ২৩ই অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৮ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া কেন গুরুতর: কর্টিসল, লিভার ও রোগের সংযোগ। বিশেষজ্ঞের পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন

 রাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙা কি শুধু চাপ? চিকিৎসক ডা. ভোজরাজ সতর্ক করে দিলেন কর্টিসল হরমোনের ভূমিকা। জানুন বৈজ্ঞানিক কারণ, ইসলামিক দিকনির্দেশনা ও স্থায়ী সমাধান।

হঠাৎ ঘুম ভাঙা—একটি উপেক্ষিত নীরব সংকেত

রাত ১টা থেকে ৩টার মধ্যে নিয়মিত ঘুম ভেঙে যাওয়াকে আমরা প্রায়শই সামান্য ক্লান্তি বা দুশ্চিন্তার ফল বলে ধরে নিই। কিন্তু ঘুম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ চাপ, হরমোনগত গোলযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি নীরব সংকেত (Silent Signal) হতে পারে। এই সমস্যাটির নাম 'স্লিপ ফ্র্যাগমেন্টেশন' (Sleep Fragmentation) বা ইনসমনিয়া উইথ মেইনটেনেন্স (Insomnia with Maintenance)।

মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার প্রধান কারণ—স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল বৃদ্ধি, লিভারের মেটাবলিক চাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণসহ ঘুমের ব্যাঘাতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এটি কর্টিসল, লিভার ও শরীরের স্ট্রেস সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। নিয়মিত হলে সতর্ক হওয়া জরুরি! 
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সঞ্জয় ভোজরাজ ব্যাখ্যা করেছেন, কেন এই লক্ষণ উপেক্ষা করা বিপজ্জনক।

 বিশেষজ্ঞের মন্তব্য: এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে WHO স্লিপ গাইডলাইনস এবং ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সঞ্জয় ভোজরাজের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে।

২. কেন মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায়? বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

মাঝরাতে জেগে ওঠার নেপথ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কর্টিসল হরমোন এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়া (Metabolic Function)।

ক. কর্টিসল—স্ট্রেস হরমোনের ভুল সময়ে বৃদ্ধি

আমাদের শরীরকে সজাগ করতে স্বাভাবিকভাবেই সকালের দিকে কর্টিসল হরমোন বৃদ্ধি পায়। কিন্তু যদি

অতিরিক্ত মানসিক চাপ (Chronic Stress)

অনিয়মিত জীবনযাপন (Irregular Lifestyle)

উদ্বেগ (Anxiety)

থাকে, তবে কর্টিসল ভুল সময়ে অর্থাৎ মাঝরাতে বৃদ্ধি পেয়ে মস্তিষ্ককে 'জেগে ওঠার সংকেত' (Wake-Up Signal) পাঠায়। ডা. সঞ্জয় ভোজরাজ একে 'অভারলোডেড স্ট্রেসিস্টেম' বলে উল্লেখ করেছেন।

খ. লিভার এবং রক্তে শর্করার অস্থিরতা

Traditional Chinese Medicine (TCM) অনুযায়ী, রাত ১টা–৩টা হলো লিভারের কার্যকারিতার সর্বোচ্চ সময়। আধুনিক ঘুম গবেষণা এটিকে সমর্থন করে।

বিপাকীয় গোলযোগ (Metabolic Dysregulation): যদি রাতে রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত কমে যায় বা বেড়ে যায়, তবে মস্তিষ্ক এটিকে বিপদের সংকেত মনে করে কর্টিসল নিঃসরণ করে, যার ফলে ঘুম ভেঙে যায়।

মাইক্রো-অ্যাওয়েকেনিংস: মায়ো ক্লিনিকের মতে, Night-time awakenings প্রায়শই বিপাকীয় অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়।

গ. মানসিক স্বাস্থ্য ও নার্ভাস সিস্টেমের অতিসক্রিয়তা

গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক চাপ কেবল ঘুমের দৈর্ঘ্যই কমায় না, ঘুমের গুণগত মানও (Sleep Quality) নষ্ট করে। এটি স্নায়ুব্যবস্থাকে (Nervous System) অতিসক্রিয় করে রাখে, যা মস্তিষ্ককে গভীর বিশ্রামে যেতে বাধা দেয়।

৩. ইসলামিক দৃষ্টিকোণ: রাতে জেগে ওঠা কি ইবাদতের সুযোগ, নাকি শরীরের সতর্কবার্তা?

ইসলাম ঘুমকে মানসিক প্রশান্তি এবং শারীরিক বিশ্রামের ভিত্তি হিসেবে দেখে।

Shutterstock

কোরআনের নির্দেশনা: কোরআনে বলা হয়েছে, “আর তিনিই তোমাদের জন্য রাতকে করেছেন পোশাকস্বরূপ, আর নিদ্রাকে করেছেন বিশ্রামের জন্য।” (সূরা ফুরকান, ২৫:৪৭)

অর্থাৎ, পূর্ণাঙ্গ বিশ্রাম বা ঘুম আল্লাহর অনুগ্রহ। এটিকে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা চাপের কারণে নষ্ট করা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী।

সুন্নাহ এবং ইবাদতের সুযোগ: রাসুল (সাঃ) এর হাদিসে মাঝরাতে জেগে ওঠাকে ইবাদতের সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে: “যে ব্যক্তি রাতে জেগে ওঠে এবং বলে— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু… তার দোয়া কবুল হয়।” (বুখারি)

এর অর্থ হলো, মাঝে মাঝে জেগে ওঠা স্বাভাবিক এবং এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ। তবে যদি এই জেগে ওঠা অসুস্থ দুশ্চিন্তা, অতিভোজন বা স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে নিয়মিত হয়, তবে ইসলামও মানসিক শান্তি ও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে উৎসাহিত করে।

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেছেন, “হৃদয়ের অশান্তি ও দুশ্চিন্তা মানুষের ঘুম ও স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।”

৪. কখন বুঝবেন এটি ভয়াবহ রোগের লক্ষণ?

মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙা স্বাভাবিক, কিন্তু নিম্নলিখিত পরিস্থিতিগুলো দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির (Long-Term Health Risks) ইঙ্গিত দেয়:

ঝুঁকির সংকেত সম্ভাব্য স্বাস্থ্য সমস্যা (WHO নির্দেশিকা অনুযায়ী)

নিয়মিততা প্রতি সপ্তাহে ৪–৫ দিন একই সময়ে ঘুম ভেঙে যাওয়া।

শারীরিক লক্ষণ বুকে চাপ, দ্রুত শ্বাস, উচ্চ রক্তচাপ, বা ঘাম হয়ে জেগে ওঠা।

দিনের বেলার প্রভাব দিনের বেলা অতিরিক্ত ক্লান্তি, মন-মরা ভাবা মনোযোগের অভাব।

দীর্ঘমেয়াদী অবস্থা ছয় মাস ধরে চলমান ইনসমনিয়া।

Export to Sheets

যেসব রোগের ইঙ্গিত হতে পারে:

স্লিপ অ্যাপনিয়া (Sleep Apnea)

সাধারণ উদ্বেগজনিত ব্যাধি (Generalized Anxiety Disorder)

থাইরয়েড বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা

মেটাবলিক সিনড্রোম (Metabolic Syndrome)

৫. সমাধান: স্বাস্থ্যকরভাবে ঘুমের মান উন্নত করার বিশেষজ্ঞ টিপস

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জীবনযাত্রার সামান্য পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ঘুমের মান ফিরিয়ে আনতে পারে।

ক. রাতের রুটিনে পরিবর্তন (Sleep Hygiene)

স্ক্রিন বর্জন: ঘুমানোর কমপক্ষে ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টেলিভিশন বন্ধ করুন।

সময় নির্ধারণ: প্রতিদিন একই সময়ে বিছানায় যাওয়া ও ওঠা অভ্যাস করুন (ছুটির দিনসহ)।

খাবার ও ক্যাফেইন: সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত ক্যাফেইন (চা/কফি) এবং ভারী খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

শোবার ঘর: শোবার ঘরটিকে অন্ধকার, শান্ত এবং তুলনামূলকভাবে শীতল রাখুন।

খ. স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও আত্মিক শান্তি

গভীর শ্বাস নেওয়া: রাতে বিছানায় শুয়ে ৫-১০ মিনিট গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন।

আল্লাহর স্মরণ (জিকির ও ইস্তিগফার): ঘুম ভাঙলে দুশ্চিন্তা না করে জিকির বা ইস্তিগফারের অভ্যাস করুন। কোরআনের নির্দেশ: “স্মরণ রেখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা রাদ, ১৩:২৮)

সূর্যস্নান: দিনের বেলায় অল্প সময়ের জন্য সূর্যের আলোতে থাকুন; এটি স্লিপ-সাইকেল ঠিক করতে সাহায্য করে।

গ. রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখুন

অনিয়মিত গ্লুকোজ ওঠানামা রাতের ঘুম ভাঙার অন্যতম কারণ। রাতে হালকা, প্রোটিনসমৃদ্ধ ডিনার করুন এবং ঘুমানোর আগে ২–৩ ঘণ্টা বিরতি রাখুন।

৬. আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ: কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?

মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া সবসময় রোগ নয়। কিন্তু যদি এটি নিয়মিত হয় এবং আপনার দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, বিশেষ করে যদি বুকে চাপ বা শ্বাসকষ্ট অনুভূত হয়, তবে সময় নষ্ট না করে একজন স্লিপ স্পেশালিস্ট বা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মানসিক শান্তি ও শারীরিক বিশ্রাম আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

আপনার সুস্থতা নিশ্চিত করতে, আজই আপনারাতেরুটিনটি পর্যালোচনা করুন।

Post a Comment

0 Comments