ইরানের সরকার বিরোধী আন্দোলন কেন ৪৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও নজিরবিহীন?
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন কেন অতীতের সব বিক্ষোভকে ছাড়িয়ে গেছে? বিশ্লেষণ, কারণ, আন্তর্জাতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।
ইরান কি এক ঐতিহাসিক মোড়ের সামনে?
ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে বহু আন্দোলন এসেছে, বহু বিক্ষোভ দমন হয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলনকে বিশ্লেষকরা বলছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। এটি শুধু কোনো নির্দিষ্ট দাবি বা শ্রেণির আন্দোলন নয়—বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক সর্বজনীন বিদ্রোহেরূপ নিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই আন্দোলন কি ইরানেরাজনৈতিক ইতিহাস বদলে দিতে পারে?
![]() |
| ইরানে নজিরবিহীন সরকারবিরোধী আন্দোলন—অর্থনৈতিক সংকট থেকে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে রাস্তায় লাখো মানুষ |
আন্দোলনের ব্যাপকতা: বড় শহর থেকে অচেনা জনপদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিস্তার। তেহরান, ইসফাহান, শিরাজের মতো বড় শহরের পাশাপাশি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে ছোট ও প্রত্যন্ত শহরগুলোতে, যেগুলোর নাম আগে জাতীয় রাজনীতিতে শোনা যায়নি।
সমাজবিজ্ঞানী এলি খোরসান্দফারের মতে,
এই বিস্তারই আন্দোলনকে অভূতপূর্ব করেছে।
২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট ছিল মূলত শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
২০১৭ ও ২০১৯ সালের আন্দোলন হয়েছিল দরিদ্র অঞ্চলকেন্দ্রিক।
কিন্তু এবারের আন্দোলনে মধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী, নারী ও তরুণ—সবাই যুক্ত হয়েছে।
অর্থনীতি থেকে শাসনব্যবস্থা: দাবির দ্রুত রূপান্তর
এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয় অর্থনৈতিক্ষোভ থেকে।
ডলারের বিপরীতে রিয়ালের ভয়াবহ দরপতন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার অসহনীয় চাপ্রথমে বাজার ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটে রূপ নেয়।
কিন্তু খুব অল্প সময়েই সেই অর্থনৈতিক প্রতিবাদ রূপ নেয় রাজনৈতিক দাবিতে।
রাস্তায় শোনা যেতে থাকে স্লোগান—
স্বৈরাচার নিপাত যাক
খামেনির অপসারণ চাই
বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই এই আন্দোলনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি সরকারের জন্য।
২০২২ বনাম ২০২৫: কীভাবে এবারের আন্দোলন আলাদা?
২০২২ সালে মাহশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানজুড়ে তীব্র আন্দোলন হয়েছিল। সেটি নারীদের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতীকী রূপ নেয়।
কিন্তু বর্তমান আন্দোলন
আরও দ্রুত ছড়িয়েছে
আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে
আরও সরাসরি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি তুলেছে
২০২২ সালের আন্দোলনে সুস্পষ্ট নেতৃত্ব ছিল না। এবার সেই শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ হচ্ছে।
রেজা পাহলভির ভূমিকা: নেতৃত্ব না প্রতীক?
নির্বাসনে থাকা রেজা পাহলভি এবারের আন্দোলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
তার আহ্বান সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তার উপস্থিতি আন্দোলনের মনোবল বাড়িয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইচ্ছার প্রতিফলন নয়।
বরং এটি একটি বাস্তবতা তুলে ধরে—
ইসলামি শাসনের বিপরীতে স্পষ্ট ও সংগঠিত ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্পের অভাব।
পাহলভি এখানে ক্ষমতার দাবিদার নয়, বরং একটি সম্ভাব্য রূপক বিকল্প।
যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প: প্রকাশ্য সমর্থনের নতুন অধ্যায়
এই আন্দোলনের আরেকটি বড় পার্থক্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য অবস্থান।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়েছেন এবং ইরান সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
২০০৯ সালে ওবামার নিরবতা আন্দোলনকারীদের হতাশ করেছিল।
এবার সেই দৃশ্যপট বদলেছে।
ইরান সরকার অবশ্য দাবি করছে, এই বিক্ষোভ বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফল।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের মিত্র এখন আগের চেয়ে অনেক দুর্বল।
আঞ্চলিক বাস্তবতা: ইরানের প্রভাব কমছে?
সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের পতন
লেবাননে হেজবুল্লাহর সামরিক দুর্বলতা
ইসরায়েল-আমেরিকার হামলায় আইআরজিসির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত
সব মিলিয়ে আঞ্চলিক প্রভাব কমার প্রতিফলন ঘটছে দেশের ভেতরেও।
অনেক ইরানি এখন প্রশ্ন তুলছে—
এই শাসনব্যবস্থা কি আদৌ আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে?
নারীদের ভূমিকা: ভয় কাটিয়ে রাস্তায়
বর্তমান আন্দোলনে নারীদের উপস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
অনেক নারী প্রকাশ্যে বলেছেন,
তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ভয়কে জয় করা।
এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনই আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভবিষ্যৎ কী বলছে: সরকার টিকবে, না পতন অনিবার্য?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
ইরান সরকার কি এই আন্দোলন দমন করতে পারবে?
সরকারের হাতে এখনও শক্ত নিরাপত্তা বাহিনী আছে।
কিন্তু আন্দোলনের বিস্তার, নেতৃত্বের আভাস, আন্তর্জাতিক সমর্থন ও জনমনের পরিবর্তন—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন।
প্রশ্ন: এবারের ইরান আন্দোলন কেন নজিরবিহীন?
উত্তর: কারণ এটি সারাদেশব্যাপী, বহু শ্রেণির মানুষকে যুক্ত করেছে এবং সরাসরি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি তুলেছে।
প্রশ্ন: রেজা পাহলভি কি ইরানের পরবর্তী নেতা?
উত্তর: বিশ্লেষকদের মতে, তিনি মূলত একটি প্রতীক। আন্দোলনকারীরা রাজতন্ত্র নয়, বিকল্প শাসনব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: এটি আন্দোলনের মনোবল বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করছে, যা আগে দেখা যায়নি।
প্রশ্ন: এই আন্দোলনের পরিণতি কী হতে পারে?
উত্তর: সরকার দমন করতে পারে, আবারাজনৈতিক পরিবর্তনের পথও খুলে যেতে পারে—সবকিছু নির্ভর করছে আন্দোলনের ধারাবাহিকতার ওপর।
ইরানের বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলন শুধু একটি বিক্ষোভ নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের ইঙ্গিত। ভয় ভেঙে মানুষ রাস্তায় নেমেছে, প্রশ্ন তুলছে শাসনের বৈধতা নিয়ে। ইতিহাসাক্ষী থাকবে—এই আন্দোলন ইরানকে কোথায় নিয়ে যায়, সেটিই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

0 Comments