পাট রপ্তানি বন্ধ করতেই বেকায়দায় ভারত! বাংলাদেশের পাশে চীন–পাকিস্তান
বাংলাদেশের কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধে চরম সংকটে ভারত। বন্ধ পাটকল, বেকার শ্রমিক আর পাল্টা জোটে চীন–পাকিস্তান।
বাংলাদেশের কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এতদিন বাংলাদেশের সস্তা কাঁচা পাটের ওপর নির্ভর করে যে ভারতীয় পাটশিল্প টিকে ছিল, সেই শিল্প এখন মারাত্মক সংকটে। বিপরীতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াচ্ছে চীন ও পাকিস্তান—যা ভারতের জন্য তৈরি করছে বড় ধরনের বাণিজ্যিক চাপ।
![]() |
| কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করতেই চাপে ভারত। বিশ্ব পাটবাজারে নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসছে বাংলাদেশ, পাশে চীন–পাকিস্তান। |
কাঁচা পাট বন্ধে থমকে গেল ভারতীয় পাটশিল্প
ভারতীয় পাটকলগুলোর একটি বড় অংশ বাংলাদেশের কাঁচা পাট আমদানির ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পর থেকেই একের পর এক পাটকল উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, ইতোমধ্যে ৪০টির বেশি পাটকল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
এর ফলে দুই লক্ষাধিক শ্রমিকাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পাটকল শ্রমিকদের বিক্ষোভ এই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে।
সরবরাহ বন্ধে ভেঙে পড়েছে ভারতের গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন
বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট এনে তা প্রক্রিয়াজাত করে ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপানে রপ্তানি করত ভারত। এখন কাঁচামালের সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় সেই পুরো সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই সংকটের মূল কারণ অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। বাংলাদেশ ছাড়া এত বিপুল পরিমাণ মানসম্মত কাঁচা পাট অন্য কোনো দেশ থেকে সংগ্রহ করা বাস্তবসম্মত নয়।
রাস্তায় নেমে এসেছে শ্রমিক অসন্তোষ
ভারতজুড়ে পাটকল শ্রমিকদের বিক্ষোভ বাড়ছে। শ্রমিকদের একটাই দাবি—
বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসে দ্রুত কাঁচা পাট আমদানি আবার চালু করতে হবে।
ভারতীয় জুট মিল অ্যাসোসিয়েশনও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে, এই সংকট ভারতের জন্য এখন ‘জীবন-মরণ’ সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানো
১৯৭১ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের পাটশিল্প ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পাটকল বন্ধ হয়ে যায়, আর সেই সুযোগে ভারত নিজের শিল্পকে শক্তিশালী করে।
কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় পাটকল পুনরায় চালু, আধুনিকায়ন এবং মূল্য সংযোজনমুখী নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও বিশ্ব পাটবাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
চীন ও পাকিস্তানের বিনিয়োগ আগ্রহ
বাংলাদেশের এই সাহসী সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখছে চীন। চীনা বিনিয়োগকারীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের পাটশিল্পে বড় বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে।
একই সঙ্গে পাকিস্তানও চট, কার্পেট ও পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আগ্রহী। এতে করে বাংলাদেশ–চীন–পাকিস্তান একটি নতুন অর্থনৈতিক জোটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভারতের জন্য বড় বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যদি কাঁচা পাট রপ্তানির বদলে নিজেই পাটজাত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে জোর দেয়, তাহলে বিশ্ববাজারে ভারতের আধিপত্য বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।
এই নতুন বাস্তবতা ভারতের জন্য একদিকে অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে কৌশলগত চাপ তৈরি করছে।
পরিবেশবান্ধব বিশ্বে পাটের গুরুত্ব বাড়ছে
প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে অবস্থান শক্ত হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে পাটের চাহিদা বাড়ছে দ্রুত। এই পরিবর্তিত বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ নতুন করে ‘সোনালি আঁশ’-এর নেতৃত্ব নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত শুধু একটি বাণিজ্যিক নীতি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার পথে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। চীন ও পাকিস্তানের সমর্থনে এই সিদ্ধান্ত ভারতের জন্যে বড় ধরনের দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে, তা বলাই বাহুল্য।

0 Comments