বাংলাদেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরার গল্প: ড. আহসান এইচ মনসুরের কঠিন সংস্কার
ব্যাংকিং নৈরাজ্য থেকে স্থিতিশীলতার পথে বাংলাদেশ। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্বে আর্থিক খাত সংস্কারের ভেতরের চিত্র ও বাস্তব বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংস্কার
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর আর্থিক খাত সংস্কার নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন
সংকটের ভেতর নেতৃত্বের পরীক্ষা
বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংস্কার সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ যখন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলার সংকট, ব্যাংক দৌড় এবং তারল্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি, ঠিক তখনই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. আহসান এইচ মনসুর।
![]() |
| বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর আর্থিক খাত সংস্কার ও ব্যাংকিং শৃঙ্খলা নিয়ে বক্তব্য রাখছেন |
এই দায়িত্ব গ্রহণ ছিল শুধু একটি প্রশাসনিক পদ নয়, বরং একটি ভাঙাচোরা আর্থিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ।
১৬ মাস পেরিয়ে আজ প্রশ্ন একটাই—তিনি কি পেরেছেন?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: পুরোপুরি নয়, তবে তিনি পথ দেখিয়েছেন।
দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ভয়াবহ বাস্তবতা
ড. আহসান এইচ মনসুর যখন গভর্নরের দায়িত্ব নেন, তখন বাংলাদেশের আর্থিক খাত কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় ছিল।
সংকটের প্রধান দিকগুলো
• বৈদেশিক মুদ্রারিজার্ভ ইতিহাসের তলানিতে
• ডলারের অস্বাভাবিক সংকট ও বিনিময় হারের অস্থিরতা
• ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য
• ব্যাংক থেকে আমানতকারীদের হুড়োহুড়ি করে টাকা তোলা
• ইসলামী ও বেসরকারি ব্যাংকে তীব্র তারল্যসংকট
• নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি আস্থার ধস
এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে এক ধরনের ভয় ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে, যা বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িকার্যক্রম প্রায় স্থবির করে দেয়।
ড. আহসান এইচ মনসুরের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ: আস্থা ফিরিয়ে আনা
আর্থিক খাতে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আস্থা। সেটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
তারল্য সংকট মোকাবিলার কৌশল
ড. মনসুর শুরুতেই স্বীকার করেন—সব ব্যাংক সমান নয়। তাই তিনি বেছে নেন লক্ষ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপ।
• দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংককে বিশেষ সহায়তা
• প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নতুনোট ছাপিয়ে স্বল্পমেয়াদি তারল্য সহায়তা
• কিন্তু লাগামহীন টাকা ছাপানোর সংস্কৃতি বন্ধ
• কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি জোরদার
এই সিদ্ধান্তগুলো তাত্ক্ষণিক আতঙ্ক কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ডলার সংকট ও রিজার্ভ স্থিতিশীলতায় দৃশ্যমান অগ্রগতি
ড. আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্বে সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি হলো বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা।
কীভাবে রিজার্ভ পতন থামল
• অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ
• রপ্তানি আয়ের দ্রুত প্রত্যাবাসন
• হুন্ডি দমনে নজরদারি
• ডলারের একাধিক রেট ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা
গুরুত্বপূর্ণ অর্জন
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে রিজার্ভে হাত না দিয়ে।
এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ঋণ ও সুদ বাবদ আরও প্রায় ১.২৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।
এটি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠনে সহায়ক হয়েছে।
ব্যাংক দৌড় থামছে, ফিরছে আমানতকারীদের আস্থা
একসময় যে ব্যাংকগুলোতে মানুষ টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছিল, সেখানে এখন চিত্র বদলাচ্ছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান কী বলছে
• ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকে পুনরায় জমা পড়েছে ১,০৮৫ কোটি টাকা
• ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ কমে এসেছে
• নগদ অর্থ নভেম্বরে ছিল ২.৭৭ লাখ কোটি টাকা
• ডিসেম্বরে কমে দাঁড়িয়েছে ২.৭৬ লাখ কোটি টাকা
এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়—মানুষ ধীরে ধীরে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরে পাচ্ছে।
ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার কঠিন সিদ্ধান্ত
ড. মনসুর শুধু আগুনেভাননি, ভবিষ্যতের আগুন ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন।
উল্লেখযোগ্য সংস্কার উদ্যোগ
• অন্তত ১২টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন
• দখলদার ও প্রভাবশালী মহলের কবল থেকে ব্যাংক উদ্ধার
• রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রচেষ্টা
• জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়ানো
এগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে বিরল কিন্তু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণ: ঝুঁকি না সমাধান
সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত ছিল একাধিক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করা।
যেসব ব্যাংক একীভূত হয়েছে
• এক্সিম ব্যাংক
• ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
• গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
• ইউনিয়ন ব্যাংক
• সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক
এই পাঁচ ব্যাংক মিলে গঠিত হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি।
মূল তথ্য
• চূড়ান্ত লাইসেন্স: ১ ডিসেম্বর
• পরিশোধিত মূলধন: ৩৫ হাজার কোটি টাকা
• সরকারের অবদান: ২০ হাজার কোটি টাকা
নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই ব্যাংকটি স্বাভাবিক লেনদেন শুরু করেছে।
খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল: বাস্তবতা বনাম সুবিধাবাদ
খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাস্তব অর্থনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পুনঃতফসিলের শর্ত
• ২ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে ঋণ নিয়মিত
• ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর
• প্রথম ২ বছর কিস্তি পরিশোধে বিরতি
• ব্যাংকের বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে
এই সিদ্ধান্ত প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন শ্বাস নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ: কোথায় সফল, কোথায় ঝুঁকি
অর্থনীতিবিদদের মতে, ড. মনসুরের সংস্কারগুলো তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য প্রয়োজন—
• খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা
• রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি দূর করা
• ব্যাংক একীভূতকরণের পর দক্ষ ব্যবস্থাপনা
• কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
পথ দেখানো নেতৃত্ব, কিন্তু লড়াই এখনো বাকি
বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংস্কার একদিনে সম্ভব নয়। ড. আহসান এইচ মনসুর কোনো জাদুকর নন। তবে তিনি এমন এক সময় দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন সিদ্ধান্ত না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতো।
তিনি শৃঙ্খলার পথ দেখিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন—রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ব্যবসায়ী সমাজ কি সেই পথে হাঁটবে?
আপনি কী মনে করেন, ড. আহসান এইচ মনসুরের সংস্কার কি যথেষ্ট?
মন্তব্যে আপনার বিশ্লেষণ জানান এবং Dhaka News–এর সঙ্গে থাকুন দেশের অর্থনীতির ভেতরের খবর জানতে।
প্রশ্ন ১: ড. আহসান এইচ মনসুরের সবচেয়ে বড় সাফল্য কী
উত্তর: রিজার্ভ পতন থামানো, ব্যাংক দৌড় কমানো এবং সুশাসনের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি।
প্রশ্ন ২: ব্যাংক একীভূতকরণ কি ঝুঁকিপূর্ণ
উত্তর: সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে ঝুঁকি আছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।
প্রশ্ন ৩: খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল কি অনৈতিকদের সুবিধা দেবে
উত্তর: প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য এটি সহায়ক, তবে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি।
{
"@context": "https://schema.org",
"@type": "News Article",
"headline": "বাংলাদেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরার গল্প: ড. আহসান এইচ মনসুরের কঠিন সংস্কার",
"description": "বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংস্কারে ড. আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্ব, সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।",
"author": {
"@type": "Person",
"name": "Dhaka News Economic Desk"
},
"publisher": {
"@type": "Organization",
"name": "Dhaka News",
"logo": {
"@type": "Image Object",
"URL": "https://dhakanews.com/logo.png"
}
},
"date Published": "2026-01-12",
"mainEntityOfPage": {
"@type": "Webpage",
"@id": "https://dhakanews.com/bangladesh-financial-sector-reform"
}
}

0 Comments