আজ শনিবার ২৪শে মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, ১৮ই শাবান ১৪৪৭ হিজরি
“এমন বাংলাদেশ দেখলে মুক্তিযুদ্ধে যেতেন না”—ডা. শফিকুর রহমানের মন্তব্যে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক
হবিগঞ্জের নির্বাচনী সমাবেশে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য—“এমন বাংলাদেশ দেখলে মুক্তিযুদ্ধে যেতেন না”—নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া।
“এমন বাংলাদেশ দেখলে হয়ত মুক্তিযুদ্ধে যেতেন না”—এই একটি বাক্যেই যেন কেঁপে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান হবিগঞ্জে দেওয়া এক বক্তব্যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন ও বর্তমান বাস্তবতার তুলনা টেনে এনে যে মন্তব্য করেছেন, তা ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই বক্তব্য শুধুই একটি রাজনৈতিক ভাষণ নয়; বরং এটি স্বাধীনতার ৫ দশক পরেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, নেতৃত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়ন নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
![]() |
এমন বাংলাদেশ দেখলে মুক্তিযুদ্ধে যেতেন না”—হবিগঞ্জের সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমানের এই মন্তব্য ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন কি আজও অপূর্ণ? |
হবিগঞ্জের সমাবেশ: কী বললেন ডা. শফিকুর রহমান
শনিবার ৭ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় হবিগঞ্জ নিউ ফিল্ড মাঠে ১১ দলীয় জোট আয়োজিত নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান নিজেকে একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন।
তিনি বলেন,
তার ভাই যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে জীবন দিয়েছিলেন, বর্তমান বাস্তবতা দেখলে হয়তো তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন না।
এই বক্তব্যের মূল সুর ছিল আক্ষেপ, ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
বক্তব্যের মূল বার্তা: মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি মূল দিক স্পষ্ট হয়।
শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রের সম্মান প্রশ্নবিদ্ধ
তিনি প্রশ্ন তোলেন,
জীবন দিয়ে দেশকে ঋণী করা মানুষদের প্রতি রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব আদৌ কি সম্মান দেখাতে পেরেছে?
তার ভাষায়,
শহীদদের স্বপ্ন ছিল—
-
ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র
-
সাম্যের সমাজ
-
অর্থনৈতিক মুক্তি
-
সুশিক্ষিত প্রজন্ম
কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটিই পূর্ণতা পায়নি।
দায় কার? জনগণ নাকি নেতৃত্ব
ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে বলেন,
এই ব্যর্থতার দায় সাধারণ জনগণের নয়।
তিনি যুক্তি দেন—
-
জনগণ বারবার ভোট দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ দিয়েছে
-
দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি
-
ভালো কাজের কৃতিত্ব যেমন তাদের, তেমনি অপকর্মের দায়ও তাদের
তার মতে, মূল সমস্যা একটি—
অসৎ নেতৃত্ব।
“যে দেশের মানুষের হাতের ছোঁয়ায় বিশ্ব বদলায়…”
তার বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি ছিল এই তুলনা।
তিনি বলেন,
বাংলাদেশের শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি বদলে দিচ্ছে, অথচ নিজের দেশের মানুষের ভাগ্য বদলাচ্ছে না।
এখানে তিনি ইঙ্গিত দেন—
-
শাসনব্যবস্থার দুর্নীতি
-
রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম বণ্টনের অভাব
-
ন্যায়বিচারের সংকট
এই বক্তব্য সরাসরি বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোর ওপর আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: কেন এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ।
মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভে নতুন চাপ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ একটি সংবেদনশীল ও শক্তিশালী ন্যারেটিভ। সেখানে “এমন বাংলাদেশ দেখলে মুক্তিযুদ্ধে যেতেন না”—এই মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই বিতর্ক তৈরি করবে।
নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে বার্তা
এই বক্তব্য নির্বাচনী সমাবেশে আসায় এটিকে একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে—
-
বর্তমান শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা তুলে ধরা
-
নৈতিক নেতৃত্বের দাবি জোরালো করা
সমর্থক ও বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া
এই বক্তব্যের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
সমর্থকদের মতে—
-
এটি শহীদদের অসম্মানের বক্তব্য নয়
-
বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি—
-
মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে
-
বক্তব্যটি ইতিহাসের প্রতি অবমাননাকর
এই দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়াই প্রমাণ করে বক্তব্যটি কতটা প্রভাব ফেলেছে।
জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল ও ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, জামায়াতে ইসলামী এই বক্তব্যের মাধ্যমে কয়েকটি লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে।
-
নৈতিক রাজনীতির দাবি পুনরুজ্জীবন
-
তরুণ ভোটারদের মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্ন তোলা
-
স্বাধীনতার আদর্শ বনাম বাস্তবতার তুলনা তুলে ধরা
এটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বক্তৃতা ও নির্বাচনী প্রচারণায় আরও জোরালো হতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্র ও নেতৃত্ব: একটি বড় প্রশ্ন
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়—
স্বাধীনতার পর ৫০ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আমরা কি সত্যিই শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি?
এই প্রশ্নের উত্তর একক নয়, কিন্তু প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই।
বিতর্কের বাইরেও যে বাস্তবতা
এই বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক চলবে, সমালোচনা হবে, রাজনৈতিক পাল্টা বক্তব্য আসবে—এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু এর বাইরেও একটি বাস্তবতা রয়েছে—
বাংলাদেশের মানুষ আজও ন্যায়, সুশাসন ও সততার নেতৃত্ব খোঁজে।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য সেই খোঁজকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
আপনি কি মনে করেন, শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ এখনো অপূর্ণ? মতামত জানান, শেয়ার করুন, আলোচনায় যুক্ত হন।
ডা. শফিকুর রহমান কোথায় এই বক্তব্য দেন?
হবিগঞ্জ নিউ ফিল্ড মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী সমাবেশে।
বক্তব্যটি কেন এত আলোচিত?
কারণ এতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার সরাসরি তুলনা করা হয়েছে।
তিনি কাকে দায়ী করেছেন?
তার মতে, সাধারণ জনগণ নয়—অসৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বই মূল দায়ী।
এটি কি নির্বাচনী কৌশলের অংশ?
বিশ্লেষকদের মতে, হ্যাঁ—এটি একটি শক্ত রাজনৈতিক বার্তা।

0 Comments