৫০ বছর কোরআনের খেদমতে নিয়োজিত শিক্ষকের ইন্তেকাল: মসজিদে নববীতে শোকের ছায়া
মসজিদে নববীতে ৫০ বছর কোরআন শিক্ষা দেওয়া শিক্ষকের ইন্তেকাল | পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন
মসজিদে নববীতে অর্ধশতাব্দী ধরে কোরআন শিক্ষা দেওয়া এক প্রবীণ শিক্ষকের ইন্তেকালে শোকের ছায়া। জানুন তাঁর জীবন, অবদান ও উত্তরাধিকার।
পবিত্র নগরী মদিনা আবারও শোকাবহ এক সংবাদে স্তব্ধ। ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থান মসজিদে নববী-তে টানা ৫০ বছর ধরে কোরআনুল কারিম শিক্ষা দেওয়া এক প্রবীণ শিক্ষকের ইন্তেকাল মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে গভীর ব্যথা তৈরি করেছে। দীর্ঘ পাঁচ দশক তিনি নিরলসভাবে শিশু, কিশোর, প্রাপ্তবয়স্ক ও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আগত তালিবুল ইলমদের কোরআন তিলাওয়াত, তাজবিদ ও তাফসির শিখিয়েছেন।
![]() |
| মসজিদে নববীতে ৫০ বছর কোরআন শিক্ষায় নিয়োজিত এক নীরব প্রহরীর বিদায়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পবিত্র নগরী মদিনা-য় |
মসজিদে নববী শুধু একটি ইবাদতের স্থান নয়; এটি জ্ঞানের এক আলোকবর্তিকা। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকেই এই মসজিদ ছিল শিক্ষা ও দাওয়াহর কেন্দ্র। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় অগণিত আলেম-উলামা এখানে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। সদ্য ইন্তেকাল করা এই শিক্ষকও ছিলেন সেই সোনালি শৃঙ্খলের এক বিনয়ী অথচ উজ্জ্বল কড়ি।
এই প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরছি তাঁর জীবন, অবদান, শিক্ষাদান পদ্ধতি, মুসলিম সমাজে প্রভাব এবং কেন তাঁর ইন্তেকাল শুধু একটি ব্যক্তিগত মৃত্যু নয়, বরং একটি যুগের অবসান।
মসজিদে নববীতে কোরআন শিক্ষার ঐতিহ্য
মসজিদে নববীর ইতিহাস ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে সাহাবায়ে কেরামদের কোরআন শিক্ষা দিতেন। পরবর্তীকালে খোলাফায়ে রাশেদিন, তাবেয়িন ও তাবে তাবেয়িনদের সময়েও এই মসজিদ ছিল ইলমের কেন্দ্র।
আধুনিক যুগে সৌদি আরব সরকার ও মসজিদ কর্তৃপক্ষ নিয়মিত হালাকাহ বা শিক্ষাচক্রের মাধ্যমে কোরআন ও হাদিস শিক্ষা চালু রেখেছে। এই পরিবেশেই অর্ধশতাব্দী ধরে শিক্ষকতা করেছেন প্রয়াত আলেম। তাঁর ক্লাস ছিল নিয়মিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
মসজিদে নববীতে শিক্ষাদানের সুযোগ পাওয়া নিজেই এক বিরল সম্মান। কঠোর যাচাই-বাছাই, ইলমি যোগ্যতা ও চরিত্রগত বিশুদ্ধতার ভিত্তিতে শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে ৫০ বছর ধরে সেখানে দায়িত্ব পালন করা মানে তিনি ছিলেন অসাধারণ আস্থা ও মর্যাদার অধিকারী।
শিক্ষকের জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
প্রয়াত শিক্ষক শৈশব থেকেই কোরআনের সঙ্গে বেড়ে উঠেছিলেন। অল্প বয়সে হিফজ সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে তাজবিদ ও কিরআতে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। মদিনায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর তিনি মসজিদে নববীর হালাকাহয় যুক্ত হন।
ধীরে ধীরে তাঁর ক্লাস জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ তিনি শুধু তিলাওয়াত শুদ্ধ করাতেনা, বরং আয়াতের অর্থ, প্রেক্ষাপট ও আমলযোগ্য দিকগুলো সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর কণ্ঠ ছিল কোমল, উপস্থাপনা ছিল বিনয়পূর্ণ, আর চরিত্র ছিল অনুকরণীয়।
তাঁর ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন দেশের আলেম, ইমাম, হাফেজ ও সাধারণ মুসল্লি। কেউ কেউ পরবর্তীতে নিজ নিজ দেশে কোরআন শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এভাবেই তাঁর শিক্ষা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।
শিক্ষাদান পদ্ধতি ও অনন্যতা
১. তাজবিদে কঠোরতা, আচরণে কোমলতা
তিনি তাজবিদের ক্ষেত্রে কখনো ছাড় দিতেনা। উচ্চারণ, মাখরাজ ও সিফাতের ভুল সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করতেন। তবে সংশোধনের ভঙ্গি ছিল সদয়।
২. আমলকেন্দ্রিক শিক্ষা
তিনি বলতেন, কোরআন শুধু পড়ার জন্য নয়, জীবনে বাস্তবায়নের জন্য। প্রতিটি আয়াতের সঙ্গে নৈতিক শিক্ষা জুড়ে দিতেন।
৩. আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ পদ্ধতি
আরবি মাতৃভাষা নয় এমন শিক্ষার্থীদের জন্য ধীরে ধীরে উচ্চারণ শেখাতেন। প্রয়োজনে অনুবাদের সহায়তা নিতেন।
৪. নিয়মিততা ও সময়নিষ্ঠা
৫০ বছরে খুব কম দিনই তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। অসুস্থতা সত্ত্বেও ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করতেন।
৫. ব্যক্তিগত সম্পর্ক
অনেক ছাত্রের খোঁজখবর রাখতেন। কারও পরিবারে সমস্যা হলে দোয়া করতেন এবং পরামর্শ দিতেন।
মুসলিম উম্মাহর প্রতিক্রিয়া
ইন্তেকালের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের বার্তা ভেসে আসে। তাঁর সাবেক ছাত্ররা লিখেছেন, তিনি শুধু শিক্ষক নন, একজন আধ্যাত্মিক অভিভাবক ছিলেন।
মদিনার স্থানীয় মুসল্লিরা জানিয়েছেন, তাঁর হালাকাহ ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত। অনেকেই বলেছেন, ফজরের পর তাঁর কোরআন শিক্ষা সেশন ছিল দিনের সেরা সময়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইসলামি প্রতিষ্ঠান তাঁরুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া মাহফিল আয়োজন করেছে।
ইন্তেকাল ও জানাজার পরিবেশ
মসজিদে নববীতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় বিপুল মুসল্লির উপস্থিতিতে। এমন একজন শিক্ষকের বিদায়ে মানুষের আবেগ ছিল স্পষ্ট। তাঁর দীর্ঘ সেবা ও অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে অনেকে চোখের জল ফেলেছেন।
পবিত্র ভূমি মদিনায় দাফন হওয়া মুসলিমদের জন্য এক বিশেষ মর্যাদা হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর জীবনের বড় অংশ যেহেতু মসজিদে নববীর সঙ্গেই কেটেছে, তাই এই নগরীতেই তাঁর চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়া অনেকের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ।
কেন এই ইন্তেকাল গুরুত্বপূর্ণ
একজন মানুষ মারা গেলে সাধারণত একটি পরিবার শোকাহত হয়। কিন্তু এমন একজন শিক্ষক ইন্তেকাল করলে হাজারো ছাত্র, তাদের পরিবার এবং অগণিত উপকারভোগী শোকাহত হন।
৫০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কোরআন শিক্ষা দেওয়া মানে কয়েক প্রজন্মকে প্রভাবিত করা। তাঁর ছাত্রদের ছাত্ররাও আজ কোরআন শিক্ষা দিচ্ছেন। এভাবে সাদাকায়ে জারিয়া হিসেবে তাঁর আমল অব্যাহত থাকবে।
ইসলামি ঐতিহ্যে আলেমদের মৃত্যু একটি অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত। কারণ জ্ঞানের আলো নিভে গেলে সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে আশা করা যায়, তাঁরেখে যাওয়া ছাত্ররাই এই আলো জ্বালিয়ে রাখবেন।
প্রশ্ন ১: তিনি কত বছর মসজিদে নববীতে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন
উত্তর: তিনি টানা প্রায় ৫০ বছর মসজিদে নববীতে কোরআন তিলাওয়াত ও তাজবিদ শিক্ষা দিয়েছেন।
প্রশ্ন ২: তাঁর শিক্ষাদানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী ছিল
উত্তর: তিনি তাজবিদে কঠোরতা বজায় রাখলেও আচরণে ছিলেন অত্যন্ত কোমল। আয়াতের অর্থ ও আমলযোগ্য দিক ব্যাখ্যা করতেন।
প্রশ্ন ৩: তাঁর ছাত্ররা কোথা থেকে আসতেন
উত্তর: সৌদি আরবসহ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁর হালাকাহয় অংশ নিতেন।
প্রশ্ন ৪: তাঁর ইন্তেকালে মুসলিম সমাজ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে
উত্তর: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকবার্তা, দোয়া মাহফিল এবং স্মৃতিচারণের মাধ্যমে মুসলিম সমাজ গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
প্রশ্ন ৫: তাঁর অবদান কীভাবে অব্যাহত থাকবে
উত্তর: তাঁর ছাত্ররা বিশ্বজুড়ে কোরআন শিক্ষা দিচ্ছেন। ফলে তাঁর শিক্ষা ও সাদাকায়ে জারিয়ার ধারা অব্যাহত থাকবে।
মসজিদে নববীতে ৫০ বছর ধরে কোরআন পড়ানো শিক্ষকের ইন্তেকাল নিঃসন্দেহে মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় ক্ষতি। তিনি ছিলেনীরব এক প্রহরী, যিনি প্রতিদিন কোরআনের আলো ছড়িয়ে গেছেন। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খ্যাতি নয়, ধারাবাহিক আমলই একজন মানুষকে মহিমান্বিত করে।
আল্লাহ তাআলা যেন তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন, কবরকে প্রশস্ত করেন এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন। আমিন।
আপনি যদি কোরআন শিক্ষা ও ইসলামি ঐতিহ্য নিয়ে আরও নির্ভরযোগ্য ও হৃদয়স্পর্শী প্রতিবেদন পড়তে চান, তাহলে আমাদের ব্লগটি নিয়মিত ভিজিট করুন। এই প্রতিবেদনটি শেয়ার করে অন্যদেরও জানার সুযোগ করে দিন এবং প্রয়াত শিক্ষকের জন্য দোয়া করুন।
{
"@context": "https://schema.org",
"@type": "News Article",
"headline": "মসজিদে নববীতে ৫০ বছর ধরে কোরআন পড়ানো শিক্ষকের ইন্তেকাল",
"description": "মসজিদে নববীতে অর্ধশতাব্দী ধরে কোরআন শিক্ষা দেওয়া এক প্রবীণ শিক্ষকের ইন্তেকালে মুসলিম উম্মাহ শোকাহত।",
"author": {
"@type": "Person",
"name": "Editorial Desk"
},
"publisher": {
"@type": "Organization",
"name": "Islamic News Blog",
"logo": {
"@type": "Image Object",
"URL": "https://example.com/logo.png"
}
},
"date Published": "2026-02-24",
"date Modified": "2026-02-24",
"mainEntityOfPage": {
"@type": "Webpage",
"@id": "https://example.com/masjid-e-nabawi-quran-teacher-death"
},
"article Section": "Islamic News",
"keywords": "মসজিদে নববী, কোরআন শিক্ষক ইন্তেকাল, মদিনা, ইসলামি খবর"
}

0 Comments