Advertisement

0

ইসলামের ইতিহাসে এক মহীয়সী নারীর অনন্য প্রজ্ঞা, অবিস্মরণীয় অবদান ও আত্মত্যাগের দীপ্তগাথা।

আজ সোমবার, ২১শে বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি।

ইসলামের ইতিহাসে এক মহীয়সী নারীর অনন্য প্রজ্ঞা, অবিস্মরণীয় অবদান ও আত্মত্যাগের দীপ্তগাথা।

নহরে জুবাইদা: হাজিদের সেবায় এক অমর প্রকৌশল কীর্তি | Dhaka News

 খলিফা হারুনুর রশিদের স্ত্রী জুবাইদা বিনতে জাফরের অমর কীর্তি নহরে জুবাইদা। ৯০০ মাইল দীর্ঘ এই পথে পানির কষ্ট লাঘবে তার ত্যাগ ও দূরদর্শিতার ইতিহাস।

ইতিহাস কেবল যুদ্ধ আর বিজয়ের গল্প নয়, ইতিহাস হলো মানবতা ও জনকল্যাণের নিরন্তর প্রচেষ্টার সাক্ষী। ইসলামের সোনালী যুগে এমন অনেক ব্যক্তিত্ব এসেছেন যারা তাদের কর্মের মাধ্যমে নিজেদের অমর করে রেখেছেন। এমনই একজন মহীয়সী নারী হলেন সম্রাজ্ঞী জুবাইদা বিনতে জাফর (রহ.)। আজ থেকে প্রায় বারোশ বছর আগে তিনি যে অসাধ্য সাধন করেছিলেন, তা আধুনিক প্রকৌশলীদেরও বিস্মিত করে। নহরে জুবাইদা নির্মাণের ইতিহাস কেবল একটি খাল খননের গল্প নয়, এটি ছিল একজন নারীর অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং ইসলামের সেবায় আত্মোৎসর্গের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

নহরে জুবাইদা মক্কায় নির্মিত ঐতিহাসিক পানির খাল, জুবাইদা বিনতে জাফরের প্রকৌশল কীর্তি ও মানবসেবার নিদর্শন
ইসলামের ইতিহাসে বিরল এক উদাহরণ—জুবাইদা বিনতে জাফর-এর উদ্যোগে নির্মিত নহরে জুবাইদা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী হাজীদের পানির কষ্ট দূর করেছে।


 ঘটনার সারসংক্ষেপ / মূল খবর

আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগে খলিফা হারুনুর রশিদের সুযোগ্য স্ত্রী জুবাইদা বিনতে জাফর (রহ.) যখন হজে যান, তখন তিনি মক্কায় এক ভয়াবহ চিত্র প্রত্যক্ষ করেন। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুচরে এক ফোঁটা পানির জন্য হাজিদের হাহাকার তাকে বিচলিত করে তোলে। তৎকালীন সময়ে জমজম কূপ ছাড়া মক্কায় আর কোনো নির্ভরযোগ্য পানির উৎস ছিল না। হাজিরা চড়া দামে পানি কিনতেন, যা ছিল সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বাইরে। এই সংকট নিরসনেই তিনি গ্রহণ করেন এক ঐতিহাসিক প্রকল্প, যা পরবর্তী এক হাজার বছর পর্যন্ত হাজিদের তৃষ্ণা নিবারণ করেছে।

বিস্তারিত তথ্য ও আপডেট

হিজরি ১৯৩ সালের সেই হজ পালনকালে জুবাইদা (রহ.) প্রত্যক্ষ করেন পানির অভাবে হাজিদের অবর্ণনীয় কষ্ট। তিনি তখনই প্রতিজ্ঞা করেন, যে করেই হোক বাগদাদ থেকে মক্কা পর্যন্ত হাজিদের যাতায়াতের পথে পানির ব্যবস্থা করবেন। তিনি তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দ করেন। প্রকৌশলীরা যখন দুর্গম পাহাড় আর মরুভূমির কঠিন শিলার কথা তুলে ধরে একে অসম্ভব বলে আখ্যায়িত করেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন— কোদালের প্রতিটি কোপের বিনিময়ে যদি আমাকে একটি স্বর্ণমুদ্রাও ব্যয় করতে হয়, তবুও আমি পিছপা হব না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য

এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সম্রাজ্ঞী জুবাইদা নিজের ব্যক্তিগত উপার্জিত অর্থ ব্যয় করেছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর নির্ভর না করে নিজের ব্যবসা ও পৈতৃক সম্পদ থেকে প্রায় ১৭ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) ব্যয় করেন। এটি ছিল তৎকালীন সময়ের এক অবিশ্বাস্য অংক, যা বর্তমান বাজার মূল্যে কয়েক হাজার কোটি টাকার সমান। এই প্রকল্পে নিয়োজিত প্রকৌশলীরা তায়েফের পাহাড়ি ঝরনা থেকে পানি এনে তা মক্কার আরাফাহ ময়দান পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার এক জটিল নেটওয়ার্ক তৈরি করেন।

আরও পড়ুন > জীবন বদলাতে ১ বছর নয়—একটি সঠিক সকালই যথেষ্ট

আরও পড়ুন > দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্তি পেতে কোরআনের ১০ আয়াত ও তার গভীর ব্যাখ্যা

ঘটনার কারণ ও পটভূমি

মক্কার ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত শুষ্ক। হাজিদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জমজম কূপের পানি সরবরাহ অপ্রতুল হয়ে পড়ছিল। মক্কায় হাজিদের পানির সংকট সমাধান করার জন্য একটি বিকল্প উৎসের প্রয়োজন ছিল অপরিহার্য। জুবাইদা (রহ.) বুঝতে পেরেছিলেন যে, স্থায়ী সমাধান ছাড়া এই কষ্ট দূর হবে না। তাই তিনি কেবল একটি কূপ খনন না করে বিশাল এক খাল বা নহর তৈরির পরিকল্পনা করেন। যা ইরাকের নু’মান উপত্যকা থেকে শুরু হয়ে তায়েফের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করত।

বিশ্লেষণ ও প্রভাব

আব্বাসীয় আমলের প্রকৌশল বিদ্যা কতটা উন্নত ছিল তার প্রমাণ এই নহরে জুবাইদা। প্রায় ৯০০ মাইল দীর্ঘ পথে এই খালটি কেবল পানিই সরবরাহ করত না, বরং বাষ্পীভবন রোধে খালের ওপর বিশেষ আচ্ছাদন এবং ভূগর্ভস্থ নালা তৈরি করা হয়েছিল। জুবাইদা রোডের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এই পথের পাশে তিনি সরাইখানা, বিশ্রামের স্থান এবং নিরাপত্তা চৌকি নির্মাণ করেছিলেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে কাসীর তার আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে জুবাইদার এই দানশীলতাকে ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখেছেন।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা / পরবর্তী পদক্ষেপ

যদিও বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মক্কায় পানি সরবরাহ করা হয়, কিন্তু নহরে জুবাইদা আজও ইতিহাসের এক অমলিন সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে। সৌদি সরকার এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এটি মুসলিম বিশ্বের নারী নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণমূলক কাজের এক আলোকবর্তিকা হয়ে আছে। জুবাইদা বিনতে জাফরের জীবনী আমাদের শেখায় যে, সম্পদ ও ক্ষমতা কীভাবে মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে হয়।

১. নহরে জুবাইদা আসলে কী?

উত্তর: এটি আব্বাসীয় সম্রাজ্ঞী জুবাইদা বিনতে জাফরের নির্দেশে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক খাল, যা হাজিদের পানির কষ্ট লাঘবে তৈরি করা হয়েছিল।

২. এই প্রকল্প নির্মাণে কত খরচ হয়েছিল?

উত্তর: ঐতিহাসিক তথ্যমতে, জুবাইদা (রহ.) তার নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ১৭ লক্ষ দিনার বা স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করেছিলেন।

৩. নহরে জুবাইদা কত মাইল দীর্ঘ ছিল?

উত্তর: ৯০০ মাইল দীর্ঘ পথের বিভিন্ন অংশে এই নহর ও আনুষঙ্গিক বিশ্রামাগার বিস্তৃত ছিল।

৪. প্রকৌশলীরা কেন এই কাজকে অসম্ভব বলেছিলেন?

উত্তর: মরুভূমির উত্তপ্ত আবহাওয়া এবং পাহাড়ের কঠিন শিলা কেটে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা সেই সময়ের জন্য অত্যন্ত জটিল চ্যালেঞ্জ ছিল।

৫. বর্তমানে কি এই নহরটি কার্যকর আছে?

উত্তর: দীর্ঘ সময় এটি কার্যকর ছিল, বর্তমানে এটি একটি ঐতিহাসিক সংরক্ষিত নিদর্শন হিসেবে সৌদি আরবে বিদ্যমান।

নহরে জুবাইদা কেবল পাথর আর পানির এক সংযোগ নয়, এটি ছিল ইমানি দৃঢ়তা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। একজন সম্রাজ্ঞী হয়েও বিলাসিতার পথে না হেঁটে তিনি বেছে নিয়েছিলেন মানবতার সেবা। আজ হাজার বছর পরেও যখন কোনো হাজি আরাফার ময়দানে দাঁড়ান, তখন অজান্তেই জুবাইদা বিনতে জাফরের সেই অমর কীর্তির কথা মনে পড়ে যায়। এই মহীয়সী নারীর অবদান সম্পর্কে আপনার মতামত কী? আমাদের কমেন্ট বক্সে জানান এবং ইসলামের ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে লেখাটি শেয়ার করুন।

লেখক: মোঃ নজরুল ইসলাম অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ও বিশ্লেষক 

সোর্স: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইবনে কাসীর), সিয়ার আলাম আন-নুবালা (ইমাম আয-যাহাবি), তারিখ-ই-বাগদাদ।[cite: 1, 2]

ইমেজ টেক্সট: ৯০০ মাইল দীর্ঘ সেবার পথ: নহরে জুবাইদা।[cite: 1, 2]

ইমেজ অল্ট টেক্সট: ঐতিহাসিক নহরে জুবাইদা খালের দৃশ্য:



Post a Comment

0 Comments