Advertisement

0

আশুরা ও মহররম মাসের প্রকৃত আমল ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

আজ রবিবার ২২শে আষাঢ় ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ৬ই জুলাই ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ, ১০ই মহররম ১৪৪৭ হিজরি, বর্ষা-কাল.

আশুরা ও মহররম মাসের গুরুত্ব, সহিহ আমল ও প্রচলিত ভুল ধারণা নিয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণ।

আশুরা ও মহররম মাসের প্রকৃত আমল ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
আশুরা ও মহররম মাসের প্রকৃত আমল ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

আশুরার প্রকৃ তাৎপর্য: 

সহিহ আমল, ইতিহাস ও বিভ্রান্তি হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এটি শুধু ইসলামি বর্ষপঞ্জির সূচনা নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর কাছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও অনুপ্রেরণামূলক মাস। শরিয়তের দৃষ্টিতে মহররম একটি সম্মানিত মাস, আর ইতিহাসের আয়নায় এটি হয়ে উঠেছে নবী-রাসুলদের অনেক ঘটনার সাক্ষী।

আশুরা (১০ মহররম) দিবসকে ঘিরে মুসলিম সমাজে বিভিন্ন আমলের চর্চা রয়েছে—কিছু সহিহাদিস দ্বারা প্রমাণিত, আবার কিছু আমল ভুল ধারণা ও দুর্বল বর্ণনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।

মহররম মাসের তাৎপর্য ও ঐতিহাসিক পটভূমি মহররম মাসকে কুরআন শরিফে ‘আশহুরুল হুরুম’ তথা সম্মানিত চার মাসের একটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে (সূরা তাওবা: ৩৬)। ইসলামের আগমনের পূর্বেই মক্কার কুরাইশরা আশুরা রোজা রাখত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও এ রোজা পালন করতেন।

মহররম মাসে বিভিন্ন নবী ও জাতির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে—যেমন, হজরত মূসা (আ.)-এর ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি, হজরত নূহ (আ.)-এর তুফান থেমে যাওয়া ইত্যাদি। এসব ইতিহাস আশুরার তাৎপর্যকে বহুমাত্রিক করেছে।

আশুরার মূল তিনটি আমল 

১. আশুরা রোজা রাখা (১০ মহররম) এই আমল সহিহাদিস দ্বারা প্রমাণিত। রাসুল (সা.) আশুরা রোজা রাখতেন এবং সাহাবাদের উৎসাহিত করতেন। রমজানে রোজা ফরজ হওয়ার আগে এটি ফরজ ছিল।

রাসুল (সা.) বলেন—

“আমি আশাকরি আল্লাহ তা’আলা এ রোজার বিনিময়ে গত বছরের গুনাহসমূহ মাফ করে দেবেন।” —(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

হাদিসে ১০ মহররমের সাথে ৯ অথবা ১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে, যেন ইহুদি ও খ্রিস্টানদের অনুকরণ না হয়।

২. পরিবারের জন্য খাদ্যপ্রশস্ততা তাবরানি ও বায়হাকিতে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে—

“যে ব্যক্তি আশুরার দিনে পরিবারে খাবারের প্রশস্ততা করবে, আল্লাহ তারিজিক সারা বছর প্রশস্ত করবেন।” —(মুজামে কবির: ১০০০৭, বায়হাকি: ৩৭৯৫)

হাদিসটি দুর্বল হলেও একাধিক সনদে বর্ণিত হওয়ায় ‘হাসান লিগাইরিহি’ পর্যায়ে গণ্য করা হয়, যার দ্বারা আমল করা জায়েয।

৩. আহলে বাইতের জন্য দোয়া ও দরুদ আশুরার দিনে হজরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদতের স্মরণে তাঁদের জন্য দোয়া পাঠ করা, দরুদ পড়া ও তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া একটি যুক্তিযুক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ আমল।

ইসলামি আদর্শ অনুযায়ী তাঁদের শাহাদতের স্মৃতিকে অশ্রু ও বেদনাভরা আবেগে সীমাবদ্ধ না রেখে তা থেকে সত্য, ন্যায় ও ত্যাগের আদর্শ গ্রহণ করাই মূল শিক্ষা।

আশুরা নিয়ে ভুল ধারণা ও কুসংস্কার অনেক সমাজে আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিল, নিজ শরীরকে আঘাত করা, শোক নাটক আয়োজন বা নাদানভাবে মাতম করা হয়—যা শরিয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ।

আশুরার প্রকৃত শিক্ষা হলো—

একত্ববাদে অবিচল থাকা

অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো

আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা

কারবালা: 

কটি মর্মান্তিক অধ্যায়, পুরো ইতিহাস নয় কারবালার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে একটি গভীর বেদনার স্মৃতি হলেও এটি আশুরার একমাত্র তাৎপর্য নয়। রাসুল (সা.)-এর যুগে, এমনকি ইসলামপূর্ব যুগেও আশুরা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাই আশুরার ঐতিহ্যকে শুধু ‘কারবালা দিবস’ হিসেবে সীমাবদ্ধ করা সত্যকে বিকৃত করার নামান্তর।

সামাজিক ও শিক্ষণীয় বার্তা আজকের মুসলিম সমাজে প্রয়োজন আশুরার প্রকৃত শিক্ষা ও সহিহ আমলের পুনরুজ্জীবন। কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন রেওয়াজ নয়, বরং হাদিসভিত্তিক আমলকে ছড়িয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে আহলে বাইতের সাহস ও ত্যাগের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে একতা, সহনশীলতা ও সত্য-নিষ্ঠার পথে অগ্রসর হতে হবে।

FAQ (প্রশ্নোত্তর) আশুরারোজা কি ফরজ? 

না, এটি মুস্তাহাবা নফল রোজা। তবে এর ফজিলত অত্যন্ত বেশি। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে এটি ফরজ ছিল।

দুই দিন রোজা কেন রাখতে হয়? 

রাসুল (সা.) ইহুদি ও খ্রিস্টানদের অনুকরণ না করে আশুরার আগে বা পরে এক দিন রোজা রাখতে উৎসাহ দিয়েছেন।

আশুরার দিনে বাড়িতে ভালো খাবার খাওয়ানোর হুকুম কী?

 হাদিসটি দুর্বল হলেও একাধিক সূত্রে এসেছে বলে গ্রহণযোগ্য। তাই পরিবারে খাবারে প্রশস্ততা প্রদর্শন করা মুস্তাহাব।

আহলে বাইতের জন্য দোয়া কি ওয়াজিব?

 ওয়াজিব নয়, তবে তাঁদের জন্য দোয়া করা ও তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করা উত্তম আমল।

কারবালার ঘটনা আশুরার মূল তাৎপর্য কি? 

না, আশুরার ঐতিহ্য পূর্ব থেকেই ছিল। কারবালার ঘটনা আশুরার তাৎপর্যে একটি বেদনাময় সংযোজন মাত্র।

Post a Comment

0 Comments