Advertisement

0

ওষুধ শিল্প নিয়ে বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য ‘ব্যক্তিগত’ সায়েদুর রহমান

 

ওষুধ শিল্প নিয়ে বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য ‘ব্যক্তিগত’ সায়েদুর রহমান

সরকারের একপেশে নীতি ও ওষুধ শিল্পের সংকট: বাস্তবতা ও বিশ্লেষণ

সরকারের একপেশে নীতির কারণে ওষুধ শিল্প সংকটে?— বাস্তবতা, বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা

ওষুধ শিল্প নিয়ে বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য ‘ব্যক্তিগত’ সায়েদুর রহমান
ওষুধ শিল্প নিয়ে বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য ‘ব্যক্তিগত’ সায়েদুর রহমান


ভূমিকা

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষ করে ওষুধ শিল্প—যা সরাসরি জনগণের জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত—এটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সবসময়ই নতুন মাত্রা পায়। সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের ‘অস্বচ্ছ ও একপেশে নীতি’কে দায়ী করে বলেছেন, এর ফলে দেশের ওষুধ শিল্প এক ধরনের সংকটে পড়েছে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে এই বক্তব্যকে একেবারেই ‘ব্যক্তিগত মতামত’ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, সরকার সবসময় জনগণের পক্ষে এবং ওষুধ শিল্পে সংকট সৃষ্টির অভিযোগ বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন।

এ প্রবন্ধে আমরা পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করব—

আসলেই কি সরকারের নীতির কারণে সংকট তৈরি হয়েছে?

বিএনপির অভিযোগ কতটা যৌক্তিক?

সরকারের পাল্টা ব্যাখ্যা কতটা বাস্তবসম্মত?

ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাত ও ওষুধ শিল্প কোন পথে এগোতে পারে?

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বর্তমান চিত্র

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে। দেশীয় উৎপাদন ৯০% এরও বেশি চাহিদা মেটাচ্ছে। তবে এই শিল্পের সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—

কাঁচামালের আমদানি নির্ভরতা – অধিকাংশ কাঁচামাল ভারত ও চীন থেকে আসে।

ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ – জনগণের জন্য দাম সাশ্রয়ী রাখার দায়িত্ব সরকারের।

গুণগত মানিয়ন্ত্রণ – আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখা জরুরি।

স্বচ্ছ নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা – অনুমোদন ও মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ আছে।

বিএনপির অভিযোগ: ‘একপেশে নীতি ও অস্বচ্ছতা’

বিএনপি দাবি করছে—

সরকারের অস্বচ্ছ নীতি ও নির্দেশনার কারণে শিল্পে সংকট তৈরি হয়েছে।

একপেশে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় জনগণের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।

বিএনপির বক্তব্যেরাজনৈতিক তাৎপর্য

বিএনপির অভিযোগ শুধু স্বাস্থ্যখাতকে কেন্দ্র করে নয়, বরং সরকারের সামগ্রিক নীতির সমালোচনার অংশ। জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে—সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে।

সরকারের প্রতিক্রিয়া: ‘জনগণের পক্ষে অবস্থান’

অধ্যাপক সায়েদুর রহমান সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেন—

ওষুধের দাম নির্ধারণে সরকার সবসময় জনগণের পক্ষে।

জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের নীতি উচ্চ আদালতে টিকে গেছে—এটি সরকারের নৈতিক বিজয়।

বিএনপির বিবৃতি ‘ব্যক্তিগত মতামত’ ছাড়া কিছু নয়।

সরকারের নীতির মূল দিকগুলো

মূল্য নিয়ন্ত্রণ – প্রায় ১০০ ওষুধের দামে ১০–৫০% পর্যন্ত পার্থক্য রয়েছে; সরকার এগুলো নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ – প্রমাণভিত্তিক নীতির ওপর কাজ করা হবে।

শিল্পকে বিরূপ না করা – কোনো কোম্পানি বা শিল্পকে টার্গেট না করে ন্যায্য নীতি প্রণয়ন।

স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের নতুন চিন্তা: ভোট ও জনগণের দাবির সাথে সংযোগ

অধ্যাপক সায়েদুর রহমানের মতে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে সবচেয়ে বড় সংস্কার হবে মানুষের চিন্তায় পরিবর্তন। তিনি উল্লেখ করেছেন—

ভোটের সময় জনগণ যেন প্রার্থীদের কাছে জানতে চান, তারা কীভাবে স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করবেন।

স্বাস্থ্যনীতি হবে ভোট নির্ধারণের অন্যতম প্রধান বিষয়।

এভাবে দেশের মানসিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটতে পারে।

এটি নিঃসন্দেহে নতুন ধরনের ধারণা—যা স্বাস্থ্যখাতকে শুধু চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গণতান্ত্রিক চর্চার সাথেও যুক্ত করছে।

আইসিইউ সংকট ও চিকিৎসক ঘাটতি

বাংলাদেশে আইসিইউ সঙ্কট দীর্ঘদিনের সমস্যা।

জনবল সংকট – যথেষ্ট ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ নেই।

অপরিকল্পিত অবকাঠামো – হঠাৎ করে আইসিইউ বেড বাড়ানো সম্ভব নয়।

শিক্ষার ঘাটতি – ৫৪ বছরে জরুরি সেবাদানের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থা হয়নি।

সমাধানের পরিকল্পনা

২০২৬ সাল থেকে বিএমইউতে ইমার্জেন্সি মেডিসিন ও জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বিষয়ে কোর্স চালু হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে জনবল তৈরি করতে হবে।

ওষুধ শিল্পের জন্য ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ও উন্নত করতে যে বিষয়গুলো জরুরি—

কাঁচামাল উৎপাদন বাড়ানো – নিজস্ব Active Pharmaceutical Ingredient (API) উৎপাদনে বিনিয়োগ।

গবেষণা ও উদ্ভাবন – আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গবেষণায় অর্থায়ন বাড়ানো।

স্বচ্ছ নীতি বাস্তবায়ন – রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নীতি প্রণয়ন।

জনগণের জন্য ন্যায্য মূল্য – জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সবার জন্য সহজলভ্য করা।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা – নীতি ও শিল্প উভয়ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক বিতর্ক বনাম বাস্তবতা

বিএনপির অভিযোগ রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ, যেখানে সরকারকে দায়ী করা সহজ কৌশল।

সরকারের ব্যাখ্যা কিছুটা আত্মপক্ষ সমর্থনের মতো শোনালেও, বাস্তব সমস্যাগুলো অস্বীকার করা যাচ্ছে না।

সত্য হলো—ওষুধ শিল্পের সামনে কাঁচামাল সংকট, স্বচ্ছতার অভাব, জনবল ঘাটতি ও মূল্য বৈষম্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

❓ সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. বিএনপির দাবি অনুযায়ী, সরকারের নীতির কারণে কি সত্যিই ওষুধ শিল্প সংকটে?

আংশিকভাবে সত্য। নীতির অস্পষ্টতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শিল্পে প্রভাব ফেলছে। তবে পুরো সংকট শুধুই সরকারের কারণে নয়; বৈশ্বিকাঁচামাল বাজারের ওঠানামা এবং গবেষণা ঘাটতিও দায়ী।

২. সরকার কীভাবে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে?

সরকার জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম নির্ধারণ করছে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে। প্রায় ১০০টি ওষুধে দামের বৈষম্য কমাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

৩. আইসিইউ সংকট কেন কাটছে না?

কারণ পর্যাপ্ত জনবল নেই, বিশেষ করে ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞের ঘাটতি রয়েছে। তাছাড়া আইসিইউ অবকাঠামো বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

৪. ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাত সংস্কারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কী হতে পারে?

ভোটারদের সচেতনতা। যদি ভোটের সময় জনগণ স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তবে রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য হবে স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দিতে।

৫. বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের সবচেয়ে বড় সুযোগ কোথায়?

আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি , নিজস্ব কাঁচামাল উৎপাদন, গবেষণা ও উদ্ভাবন

উপসংহার

ওষুধ শিল্প ও স্বাস্থ্যখাত কোনো রাজনৈতিক দলের একক দায়িত্ব নয়—এটি সমগ্র জাতির। বিএনপি সরকারের নীতির সমালোচনা করেছে, সরকার পাল্টা ব্যাখ্যা দিয়েছে—কিন্তু বাস্তবতা হলো, জনগণের জন্য ওষুধের সাশ্রয়ী দাম ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এগোয়, তবে ওষুধ শিল্প সংকট কাটিয়ে একটি শক্তিশালী খাত হিসেবে বৈশ্বিক মঞ্চে অবস্থান করতে পারবে।

Post a Comment

0 Comments