আজ বুধবার ৭রা কার্তিক ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২২ অক্টোবর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৭ হিজরি
লেখক মোঃ নজরুল ইসলাম
আল্লাহর আয়াত অস্বীকারকারীদের কঠোর শাস্তির ঘোষণা: অন্যায়ভাবে নবী ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিদের হত্যাকারীদের ভয়াবহ পরিণতি
যারা আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করে, অন্যায়ভাবে নবী ও ন্যায়পরায়ণদের হত্যা করে, তাদের জন্য কুরআন ঘোষণা দিয়েছে ভয়াবহ শাস্তির। জানুন সূরা আলে ইমরান ৩:২১-এর গভীর বিশ্লেষণ, হাদীস ও তাফসির-ভিত্তিক ব্যাখ্যা।
![]() |
| আল্লাহর আয়াত অস্বীকারকারীদের শাস্তি সম্পর্কে কুরআনের সতর্কবার্তা তুলে ধরা ইসলামী ব্লগ পোস্টের ফিচার ইমেজ। |
আল্লাহর আয়াত, নবী হত্যা, কুরআনের শাস্তি, ন্যায়পরায়ণদের পরিণতি, ইসলামিক শিক্ষা, সূরা আলে ইমরান ৩:২১
যুগে যুগে সত্য-প্রচারক নবী ও ন্যায়পরায়ণ মানুষদের উপর যারা অত্যাচার করেছে, তারা কখনোই পরিত্রাণ পায়নি। কুরআন ঘোষণা করেছে — এমন অন্যায়কারীদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। এই আয়াত মানবতার প্রতি এক অনন্ত সতর্কবার্তা।
🕋إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَيَقْتُلُونَ الَّذِينَ يَأْمُرُونَ بِالْقِسْطِ مِنَ النَّاسِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ
“নিশ্চয় যারা আল্লাহর আয়াতসমূহে কুফরী করে, অন্যায়ভাবে নবীদের হত্যা করে এবং মানুষের মধ্যে যারা ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দেয় তাদেরকে হত্যা করে—আপনি তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দিন।”
(সূরা আলে ইমরান: ২১)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন এক শ্রেণীর মানুষকে সতর্ক করেছেন, যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং যারা ন্যায়ের পথে আহ্বান জানায় তাদের নিপীড়ন করে। এটি শুধু অতীতের কাহিনি নয়—বরং প্রতিটি যুগে যারা অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়, তাদের জন্যও এই ভয়াবহ সতর্কবার্তা।
“ন্যায়পরায়ণদের রক্ত বৃথা যায় না—আল্লাহর আদালত থেকে কেউ রেহাই পাবে না।”
“কুফর” অর্থ ঢেকে ফেলা বা অস্বীকার করা। আল্লাহর আয়াত মানে শুধু কুরআনের বাণী নয়, বরং তাঁর প্রতিটি নিদর্শন। যারা তা অস্বীকার করে, তারা নিজেদের অন্তরে অন্ধকার সৃষ্টি করে।
কুরআনে বলা হয়েছে: “যারা কুফরি করে, তাদের কাজ মরুভূমির মরীচিকার মতো।” (সূরা আন-নূর: ৩৯)
নবী হত্যার ইতিহাস ও মানবতার লজ্জা
ইহুদি জাতি বহু নবীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল। যেমন—যাকারিয়া (আঃ) ও ইয়াহইয়া (আঃ)-কে। এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট অপরাধ, কারণ নবীরা ছিলেন সত্যের আলো। তাদের হত্যা করা মানে আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিদের হত্যার চক্রান্ত
যারা সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের উপরও আঘাত এসেছে। কুরআনের এই আয়াত আজকের বাস্তবতার সঙ্গেও মিলে যায়—যখন সত্যবাদীরা নীরবতা বেছে নিতে বাধ্য হয় ভয় ও হুমকির কারণে।
কুরআনের ভাষায় শাস্তির ঘোষণা
“ফাবাশশিরহুম বি আযাবিন আলীম”—
এই শব্দগুচ্ছের মধ্যে উপহাস মিশ্রিত কঠোর সতর্কতা আছে।
‘বাশশির’ অর্থ সুসংবাদ দেওয়া, কিন্তু এখানে তা ব্যবহৃত হয়েছে শাস্তির সংবাদ দিতে—অর্থাৎ, এমন পরিণতি যার কষ্টে তারা কাঁপবে, তবু মুক্তি পাবে না।
হাদীসের আলোকে সতর্কবার্তা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল।”
(বুখারী, মুসলিম)
এই হাদীস আয়াতটির বাস্তব প্রয়োগকে আরো স্পষ্ট করে—ন্যায়পরায়ণ মানুষকে হত্যা মানে সমাজ ও মানবতার আলো নিভিয়ে দেওয়া।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান ও ইবনে কাসীরের বিশ্লেষণ
তাফসীরবিদগণ বলেন—
এই আয়াতে কেবল অতীতের ইয়াহুদিদের নয়, ভবিষ্যতের সেই সব জাতির কথাও বলা হয়েছে যারা আল্লাহর বাণী অমান্য করে এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারীদের নিপীড়ন করে।
আল্লাহ এমনদের বিরুদ্ধে পৃথিবীতেই লাঞ্ছনা ও আখিরাতে চিরস্থায়ী শাস্তি ঘোষণা করেছেন।
ইসলামিক চিন্তাবিদ ও সাংবাদিক বলেন—
“এই আয়াত শুধু ইতিহাসের বিবরণ নয়, এটি এক চিরন্তন আইন। আল্লাহর বাণী ও ন্যায়ের কণ্ঠ রোধের চেষ্টা যতদিন চলবে, ততদিন এই আয়াতের হুঁশিয়ারি প্রাসঙ্গিক থাকবে। এটি আমাদের সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহ্বান।”
প্রশ্ন ১: এই আয়াত কি কেবল ইহুদিদের জন্য নাকি সবার জন্য?
উত্তর: তাফসীর অনুযায়ী, এটি ঐতিহাসিকভাবে ইহুদিদের উল্লেখ করলেও এর শিক্ষাটি সর্বজনীন। যে জাতি বা ব্যক্তি একই অপরাধ করে, তারাও এই শাস্তির আওতাভুক্ত।
প্রশ্ন ২: ন্যায়পরায়ণদের সাহায্য করা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: কুরআন বারবার বলেছে—“তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় থাকো।” (সূরা নিসা: ১৩৫)।
ন্যায়পরায়ণদের সহায়তা করা মানে আল্লাহর পক্ষে দাঁড়ানো।
প্রশ্ন ৩: আজকের যুগে এই আয়াতের শিক্ষা কী?
উত্তর: আজও সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ মানুষকে হুমকি দেওয়া হয়। এই আয়াত আমাদের শেখায়—অন্যায় দেখেও নীরব থাকা ঈমানের পরিপন্থী।
এই আয়াত মানবতার প্রতি এক গভীর সতর্কবার্তা।
যারা আল্লাহর নির্দেশ অস্বীকার করে, নবী ও ন্যায়পরায়ণদের হত্যা করে, তারা কেবল ইতিহাসে কলঙ্কিত নয়—বরং আখিরাতেও কঠোর শাস্তির অধিকারী হবে।
আল্লাহর আইন চিরন্তন; সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই প্রকৃত ঈমানের প্রকাশ।

0 Comments