মাওলানা উপাধির ইতিহাস, অর্থ ও বিভিন্ন মাজহাবে ব্যবহার | সম্পূর্ণ গাইড
মাওলানা শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে আসে দক্ষিণ এশিয়ার সম্মানিত আলেম-উলামাদের কথা। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে প্রায় প্রত্যেক ধর্মীয় ব্যক্তির নামের আগে এই উপাধি যুক্ত থাকে। কিন্তু এই শব্দের আসল অর্থ কী? কখন থেকে চালু হলো? আর হানাফি, শাফি, মালিকি, হাম্বলি মাজহাবে কীভাবে ব্যবহৃত হয়?
মাওলানা শব্দের আক্ষরিক অর্থ কী?
মাওলানা (আরবি: مولانا) দুটি শব্দের যোগফল:
মাওলা (مولا) → প্রভু, অভিভাবক, মনিব, বন্ধু, সাহায্যকারী, নেতা, গুরু, আত্মীয় ইত্যাদি। এর প্রায় ৩০টি অর্থ রয়েছে।
না (نا) → “আমাদের” বা “আমরা”।
তাই মাওলানা মানে “আমাদের অভিভাবক” বা “আমাদের মাওলা”। এটি আল্লাহ তা’আলার জন্যও ব্যবহার হয়, আবার সম্মানিত মানুষের জন্যও।
কুরআন ও হাদিসে মাওলা/মাওলানা শব্দের ব্যবহার
![]() |
| মাওলানা উপাধির প্রকৃত অর্থ কী? কবে থেকে শুরু, কেন ব্যবহৃত হয় এবং বিভিন্ন মাজহাবে এর ভিন্নতা—জানুন একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডে। |
কুরআন মজীদে মাওলা শব্দটি বিভিন্ন অর্থে এসেছে:
সূরা বাকারা ২:২৮৬ → অভিভাবক
সূরা মুহাম্মদ ৪৭:১১ → বন্ধু
সূরা তাহরীম ৬৬:৪ → সহযোগী
হাদিসে:
রাসূলুল্লাহ ﷺ আলী রা. সম্পর্কে বলেছেন: “আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা।” (গাদীর খুমের ঘটনা)
রাসূল ﷺ যায়েদ বিন হারিসাকে “মাওলানা” বলে সম্বোধন করেছেন।
সাহাবায়ে কেরাম রাসূল ﷺ-কে এবং আলী রা.-কে “মাওলানা” বলে সালাম দিতেন।
সুতরাং এটি শিরক নয়, বরং সম্মান ও ভালোবাসার প্রকাশ।
মাওলানা উপাধির ইতিহাস
নবী যুগ থেকেই শুরু → সাহাবীগণ এই শব্দ ব্যবহার করতেন।
মধ্য এশিয়া ও সুফি ঐতিহ্য → জালালুদ্দিন রুমি (মেভলানা রুমি) নামে বিখ্যাত।
ভারত উপমহাদেশে প্রসার → ১৮শ শতাব্দী থেকে আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর মাদ্রাসা গ্র্যাজুয়েটদের জন্য সম্মানসূচক উপাধি হিসেবে চালু হয়। হাসান বসরী (রহ.)-এর নামেও মাওলানা যুক্ত হতো।
আজকের দিনে দক্ষিণ এশিয়ায় দারুল উলুম দেওবন্দ, আলিয়া মাদ্রাসা থেকে স্নাতক হলে সাধারণত “মাওলানা” বলা হয়।
বিভিন্ন মাজহাবে মাওলানা উপাধির ব্যবহার
সব চারটি সুন্নি মাজহাবেই আলেমদের সম্মান দেওয়া হয়, কিন্তু শব্দের প্রচলন আঞ্চলিকভাবে ভিন্ন:
হানাফি মাজহাব (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, মধ্য এশিয়া):
সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত। দারুল উলুম দেওবন্দ, জামিয়া আশরাফিয়া ইত্যাদি মাদ্রাসার গ্র্যাজুয়েটরা মাওলানা। উদাহরণ: মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী।
শাফি মাজহাব (ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিশরের কিছু অংশ):
সাধারণত “শায়খ” বা “উস্তাজ” বলা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কখনো কখনো মাওলানা ব্যবহার হয়।
মালিকি মাজহাব (উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা):
“শায়খ” বা “ইমাম”। মাওলানা খুব কম।
হাম্বলি মাজহাব (সৌদি আরব, কাতার):
“শায়খ” অত্যন্ত জনপ্রিয়। উদাহরণ: শায়খ ইবনে বাজ, শায়খ উসাইমিন।
শিয়া মাজহাবে:
আয়াতুল্লাহ, গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ, আল্লামা। মাওলানা কম ব্যবহৃত।
অন্যান্য অঞ্চলে:
আরব দেশ → শায়খ, মুফতি
ইরান → মুল্লাহ, হুজ্জাতুল ইসলাম
তুরস্ক → মেভলানা (রুমির ক্ষেত্রে)
মাওলানা vs অন্যান্য উপাধি
মাওলানা → মাদ্রাসা গ্র্যাজুয়েট, সাধারণ আলেম
আল্লামা → গভীর জ্ঞানী, পণ্ডিত (যেমন আল্লামা ইকবাল, আল্লামা সাঈদী)
শায়খ → আরবি ভাষায় সাধারণ সম্মান
মুফতি → ফতোয়া দেওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন
শায়খুল ইসলাম → সর্বোচ্চ সম্মান (যেমন মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী)
মাওলানা উপাধি ইসলামের কোনো নতুন আবিষ্কার নয়, বরং কুরআন-হাদিস থেকেই এর শিকড়। এটি শুধু সম্মানের প্রকাশ, কোনো শিরক নয়। বিশেষ করে হানাফি মাজহাব অনুসারী দক্ষিণ এশিয়ায় এই উপাধি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
আপনার কাছে কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করুন। আপনার পরিচিত মাওলানাকে সম্মানের সাথে ডাকুন – এটাই সুন্নাত।
আরও পড়ুন:
মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর জীবনী
চার মাজহাবের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
(এই পোস্টটি সোর্স: বাংলা উইকিপিডিয়া, ইংরেজি উইকিপিডিয়া Marla ও Lama পেজ, বিভিন্ন ইসলামিক ফতোয়া সাইট থেকে সংগৃহীত। কোনো ভুল হলে ক্ষমা প্রার্থী।)2 / 2১.৩so্রুত

0 Comments