আজ রবিবার, ৭ই আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২১ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই মুহাররম, ১৪৪৮ হিজরি

ইসমায়েল সাইবারির দ্রুততম গোলে স্কটল্যান্ডকে চাপে ফেলল মরক্কো, গড়লেন বিশ্বকাপের নতুন রেকর্ড

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে নিজেদের দুর্দান্ত ছন্দ ধরে রেখেছে মরক্কো। ‘সি’ গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের শুরুতেই গোল করে নতুন রেকর্ড গড়েছেন মরক্কোর আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার ইসমায়েল সাইবারি। তার করা গোলটি চলতি আসরের দ্রুততম গোল হিসেবে রেকর্ড বইয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ফক্সবোরোতে বোস্টন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে মুখোমুখি হয় মরক্কো ও স্কটল্যান্ড। ম্যাচ শুরুর মাত্র ৭১ সেকেন্ডের মাথায় গোল করে দলকে এগিয়ে দেন সাইবারি। প্রথমার্ধ শেষে সেই একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল উত্তর আফ্রিকার দেশটি।

মরক্কোর জার্সিতে ইসমায়েল সাইবারি গোল উদযাপন করছেন, পেছনে হতাশ স্কটল্যান্ডের খেলোয়াড়রা।
ম্যাচের শুরুতেই ইসমায়েল সাইবারির দুরন্ত গোল! স্কটল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করল মরক্কো। 


ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে খেলতে নামে মরক্কো। রেফারির শুরুর বাঁশি বাজার পরপরই বলের নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। ম্যাচের মাত্র ১৪ সেকেন্ডের মাথায় বল পেয়ে দ্রুত আক্রমণ সাজাতে শুরু করে মরক্কোর খেলোয়াড়রা। কয়েকটি দ্রুত পাস বিনিময়ের পর মাঝমাঠ থেকে আসা একটি উড়ন্ত বল নিয়ন্ত্রণে নেন সাইবারি।

স্কটল্যান্ডের রক্ষণভাগকে পাশ কাটিয়ে বক্সে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর জোরালো শটে স্কটিশ গোলরক্ষক অ্যাঙ্গাস গুনকে পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে দেন। গোলটি এত দ্রুত এসেছে যে স্কটল্যান্ডের খেলোয়াড়রা রক্ষণ গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগই পাননি। বিশ্বকাপের চলতি আসরে এটিই সবচেয়ে দ্রুততম গোল। টুর্নামেন্টের প্রথম সপ্তাহে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গোল দেখা গেলেও সময়ের হিসেবে সাইবারির গোল এখন পর্যন্ত সবার ওপরে অবস্থান করছে।

আরও পড়ুন > নেইমারের চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন স্কটল্যান্ড ম্যাচে ব্রাজিলের স্বপ্ন জাগাবে কি

আরও পড়ুন > জাপান-তিউনিসিয়া বিশ্বকাপের ১০০০তম ম্যাচে ইতিহাস গড়ার লড়াই

আরও পড়ুন >  হাইতিকে উড়িয়ে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ বার্তা

এই গোলের মাধ্যমে আরেকটি উল্লেখযোগ্য কীর্তিও গড়েছেন মরক্কোর এই ফুটবলার। বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচেই গোল করার মাধ্যমে তিনি আফ্রিকার দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে এমন অর্জনের মালিক হয়েছেন। এর আগে ২০১৮ সালেরাশিয়া বিশ্বকাপে মিশরের মোহাম্মদ সালাহ প্রথম আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন।

সাইবারির বর্তমান ফর্ম মরক্কোর জন্য বড় আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন তিনি। শক্তিশালী ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচের ২১তম মিনিটে চমৎকার এক ভলিতে গোল করে দলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন মরক্কোর এই মিডফিল্ডার।

সেই ম্যাচে ব্রাজিল পরে সমতা ফেরাতে সক্ষম হলেও সাইবারির গোলটি মরক্কোর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ১-১ সমতায় শেষ হয়। তবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মরক্কোর পারফরম্যান্স বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন সাইবারি। ম্যাচের শুরুতেই গোল করে শুধু দলকে এগিয়ে দেননি, বরং প্রতিপক্ষের ওপর মানসিক চাপও তৈরি করেন। প্রথম গোলের পর মরক্কো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার চেষ্টা করে এবং প্রথমার্ধজুড়ে সেটি অনেকটাই সফলভাবে করতে দেখা যায়।

পরিসংখ্যান বলছে, প্রথমার্ধে বলের দখলে স্পষ্ট আধিপত্য ছিল মরক্কোর। তারা প্রায় ৬২ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে স্কটল্যান্ড বলের দখল ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করলেও আক্রমণভাগে তেমন কার্যকর উপস্থিতি দেখাতে পারেনি।

মরক্কোর মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের সমন্বিত খেলা স্কটল্যান্ডকে চাপে রাখে পুরো প্রথমার্ধে। সাইবারির পাশাপাশি দলের অন্যান্য আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রাও কয়েকটি সম্ভাবনাময় আক্রমণ গড়ে তুলেছিলেন। যদিও সেগুলো থেকে আর কোনো গোল আসেনি।

স্কটল্যান্ডও ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালায়। তবে মরক্কোর সংগঠিত রক্ষণভাগ তাদের সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি। বিশেষ করে মাঝমাঠে মরক্কোর নিয়ন্ত্রণ স্কটিশদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বকাপের এবারের আসরে মরক্কোকে ঘিরে প্রত্যাশা আগেই তৈরি হয়েছিল। ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছে ইতিহাস গড়ার পর দলটি আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপেও।

ব্রাজিলের বিপক্ষে ড্র করার পর স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয় মরক্কোর জন্য গ্রুপপর্বে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এনে দিতে পারে। কারণ গ্রুপ ‘সি’-তে প্রতিটি পয়েন্টই শেষোলোতে ওঠার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, সাইবারির বর্তমান ফর্ম মরক্কোর সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি। তিনি শুধু গোল করছেনা, বরং আক্রমণভাগে গতি ও সৃজনশীলতা যোগ করছেন। দলের আক্রমণভাগকে কার্যকর করে তোলার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

মরক্কোর কোচিং স্টাফও সাইবারির ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্লাব ও জাতীয় দল—দুই পর্যায়েই ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছেন তিনি।

অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের জন্য এই ম্যাচটি ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। কিন্তু ম্যাচের শুরুতেই গোল হজম করায় তাদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়। দ্রুত সমতা ফেরানোর চেষ্টায় তারা আক্রমণ বাড়ালেও প্রথমার্ধে সফল হতে পারেনি।

স্কটিশ সমর্থকদের আশা ছিল দ্বিতীয়ার্ধে দলটি আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলবে। তবে প্রথমার্ধের পরিসংখ্যান এবং মাঠের পারফরম্যান্সে মরক্কোই ছিল এগিয়ে।

বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে দ্রুততম গোলেরেকর্ড গড়া যে কোনো খেলোয়াড়ের জন্য বিশেষ অর্জন। সাইবারির জন্যও এটি ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে আফ্রিকান ফুটবলের প্রতিনিধিত্বকারী একজন খেলোয়াড় হিসেবে তার এই সাফল্য মহাদেশটির ফুটবল ইতিহাসেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

মরক্কো এখন আশা করবে, সাইবারির এই দুর্দান্ত ফর্ম টুর্নামেন্টের পরবর্তী ম্যাচগুলোতেও অব্যাহত থাকবে। কারণ বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত দলকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেয়।

প্রথম দুই ম্যাচে গোল করে ইতোমধ্যে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন সাইবারি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তার দ্রুততম গোল মরক্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এনে দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বকাপের চলতি আসরের অন্যতম আলোচিত ঘটনাতেও পরিণত হয়েছে।

গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলোতে মরক্কো তাদের এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে পারলে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়ার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হবে। আর সেই স্বপ্নপূরণের পথে ইসমায়েল সাইবারি যে অন্যতম প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছেন, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্সেটিই আরও একবার স্পষ্ট করে দিয়েছে।